Translate

শুক্রবার, ২৬ অক্টোবর, ২০১৮

উন্নত মন

#উন্নত_মন
#রচনায় #প্রিয়ম্বদাপ্রিয়া
         রান্না ঘরে আদা পিষতে পিষতে মা মেজাজে বলে গেলেন ..."শোন সৌভিক নতুন ব্যবসা শুরু করেছিস মন দিয়ে কর কিন্তু প্রেম করে একটা মেয়ের হাত ধরে যদি বলিস মা আমি একেই বিয়ে করব তবে কিন্তু ঝাঁটা পেটা করব। আমি ঐটে সহ্য করব না বৌ আনব আমার পছন্দের।"সৌভিক বিরক্ত হয়ে মায়ের কথা গুলো শুনল। বিড় বিড় করে বলতে লাগল মায়ের ঐ বৌ আনব নিজের পছন্দে।কেন আমি পছন্দ করতে পারি না।দাদা মুচকে হাসল ..."ঐ ভুলটি কর না বাবু তোর বৌদিকেও মা পছন্দ করেছে তোর বৌটিও মায়ের পছন্দেই আসবে।" বৌদিও এইসকল বার্তালাপের মাঝে ফোড়ন কাটল ..."সৌভিক পছন্দ করে কাউকে আনলে ঐ ঝাঁটা পেটাটা দেখতে পাব কি বল।" সৌভিক রাগে গজ গজ করে ওঠে ..."কেমন বৌদি তুমি এখনও কাউকে পছন্দই হল না আর তুমি আমার ভবিষ্যতের ঝাঁটার বাড়ির দৃশ্য কল্পনা করছ।"দাদা হাসে ..."আগে ব্যবসাটা ভালো করে দাঁড় করা তারপর প্রেম করবি।"
   


      সৌভিক বেরল দোকানের পথে। কলেজ পড়া কালীনই সৌভিক ঠিক করেছিল ও স্বাধীন ব্যবসা করবে।একটা দোকান ভাড়া নিয়ে কসমেটিক্সের ব্যবসা শুরু করেছে। সকাল বেলা দোকান খুলে ধুপ ধুনো দিয়ে রোজকার মতন দোকান খুলেছে। দু চার জন কাস্টমার এসেছেন।তার মধ্যে দেখে দোলনক।ওকে দেখে  একগাল হাসল সৌভিক।বললো..."আরে দোলন যে কেমন আছ? "দোলন ম্লান ভাবে বললো ..."ভালোই।"একটা শ্যাম্পু কিনে কেমন মন মরা ভাবে চলে গেল দোলন।একটু অবাক লাগল সৌভিকের। কলেজের বন্ধু পবিত্রর বোন দোলন। মাত্র ঊনিশ বছর বয়সে ওর বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। ভালো ছেলে পেয়েছিল বয়স বেশী ছিল কিন্তু ভালো চাকরি দেখে বাড়ি থেকে বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল। আজ অনেক দিন পর আবার দেখা হল। দোকানে বসে সৌভিকের স্মৃতি থেকে ভেসে এল দোলনের বিয়ের কথা। সব বন্ধুরা মিলে খুব মজা করেছিল। আজও মনে আছে ওদের বিয়েতে লেমন রসগোল্লাটা সবার খুব ভালো লেগেছিল।
..."দাদা বাজারে ভালো ডিও কি এসেছে। "কাস্টমারের আগমনে আবার সৌভিকের ধ্যান ভাঙল।
     




       দুপুরে দোকান বন্ধ করে বাড়ি গিয়ে খাওয়া দাওয়া করতে যায় সৌভিক।দুপুরে বাইরে খাঁ খাঁ  করছে রোদ রাস্তায় ট্র্যাফিক বিনা ক্লান্তিতে এগিয়ে চলেছে। ফুটপাথের উপর একটা নেড়ি কুকুর রাস্তায় পড়ে থাকা খাবারের প্যাকেট শুঁকছিল।চারিপাশটা কেমন শূন্য তাও সব কিছুই তো আছে।সকলের গন্তব্য স্থলে পৌছবার তাড়া।দুপুরের তাপের হাত থেকে রেহাই পেতে ঘরের শীতল ছায়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিল সৌভিক। বাসস্টপে গিয়ে দেখে দোলন দাঁড়িয়ে। রোদের তাপে মুখ চোখ কালো চুল ঘামে ভেজা। সৌভিক বলল ..."কি গো ভর দুপুরে কোথায় চললে? "দোলন ফ্যাকাসে চোখে তাকিয়ে রইল।সৌভিকের মনে হল ওর মনের অবস্থা মোটেও ভালো নেই হয়ত মন খুলে সমস্যার কথা বললে খানিকটা স্বাভাবিক হতে পারবে। তাই বললো ..."চল তো আমার সঙ্গে দোকানে।এই রোদ্দুরে কোনও কথা হয় না। "সৌভিক ওকে সঙ্গে করে আবার দোকানে ফিরে এল।
..."বল তো তোমার কি হয়েছে? সকালেও কেমন যেন দেখলাম। "দোলন প্রথমে একটু ইতস্তত করছিল তারপর বললো ..."অনেক সমস্যায় আছি। "সৌভিক বলে ..."আরে সেই সমস্যাটাই তো শুনব বলে তোমায় বাসস্টপ থেকে দোকানে নিয়ে এলাম। "দোলন যেন সৌভিকের কথায় খুব আপন বোধ করল।বললো ..."আমি মোটেও ভালো নেই গো। বিয়ের প্রথম প্রথম বুঝিনি তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে শুরু করলাম আমার হাজবেন্ড বড্ড সংকীর্ণ মানসিকতার মানুষ। কথায় কথায় আমায় সন্দেহ করে। এক একদিন আমাকে বাড়িতে লক করে রাখে।বন্ধু বান্ধব কারও সঙ্গেই কোনও যোগাযোগ রাখতে দেয় না। অনেক দিন পর বাড়িতে এসেছিলাম ও অফিস ট্যুরে গেছে সেই সুযোগে অনেক ঝামেলা করে এসেছি। বাড়িতে সব জানে তাও কেউ কিছু বলে না আমার পাশে দাঁড়াবার কারই প্রবৃত্তি নেই আমি যতই অভিযোগ করি বাড়িতে শুধু বলে সব ঠিক হয়ে যাবে। দু বছর ধরে তো সহ্য করছি ঠিক কোথায় হল।" বলে দোলন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সৌভিক বলল ..."তুমি নিজে কিছু কর। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে কিছু করার চেষ্টা কর কারও ভরসা করছ কেন। "দোলন মৃদু হাসল ..."ঊনিশ বছর বয়সে আমার বিয়ে হয়েছে আমি মাত্র উচ্চ মাধ্যমিক পাশ। কি দাঁড়াব। "
..."তাহলে কি করবে কিছু ভেবেছ সারা জীবন বন্দি হয়ে থাকবে? লড়বে না? "দোলন চুপ করে রইল সৌভিক আবার বলল ..."আমার দোকানে একজন হেল্পার চাইছিলাম তুমি চাইলে করতে পার। আর বন্দি জীবন থেকে যদি মুক্তি চাও তার জন্য আমি আছি তোমার পাশে ভয় পেও না। "

      সেদিন কোনও কথার উত্তর না দিয়েই চলে গেল দোলন। সৌভক বেশ কিছুদিন ভেবেছিল দোলনের কথা। মেয়েটার কত ছোট্ট বয়সে বিয়ে হয়ে গেল এখন কেমন কষ্টে আছে। যদি কিছু ওর জন্য করা যেত তবে খুব ভালো লাগত সৌভিকের।
       



       প্রায় দু মাস পর একদিন সকালে সৌভিক দেখে ওর দোকানে দোলন এসে হাজির। ওকে দেখে একটু অবাক হল সৌভিক।দোলন বলল ..."তোমার কাজটা কি এখনও ফাঁকা আছে।"সৌভিকের দোকানে কাজটা তখনও খালিই ছিল। ও বললো ..."হুম। তা তুমি দোকানে কাজ করবে? "
মাথা নাড়ল দোলন। ওকে দেখে মনে হচ্ছিল ও কাজটা সত্যি করতে চায়।সৌভিকও রাজি হয়ে গেল।




সৌভিকের দোকানে কাজটা পাওয়ার পর মনোযোগ সহকারে কাজে মন দিল দোলন।পরিশ্রমী মেয়েটা কখনও কাজের হিসেব করে না।নতুন জিনিস এলে তাতে ডিসকাউন্ট অনুযায়ী প্রাইস লেবেল করা। ঝাড়পোছ করা, কাস্টমারদের জিনিস পত্র দেখানো,সব নিখুঁত ভাবে করে দোলন। দোকানের কোথায় কি আছে সব ওর নখ দর্পনে। একদিন দোকান বেশ ফাঁকা যাচ্ছিল। দুজনেই চুপচাপ বসে। তখন দোলন হঠাৎ বলল ..."জান তোমার কথা গুলো আমার মনে বেশ জোর জুগিয়েছিল। "সৌভিক বলে ..."কেমন করে? "
..."ঐ যে বলেছিলে লড়বে না বন্দি থাকবে। আমি ভাবলাম লড়েই দেখি না বিয়ের কিছু গয়না বেঁচে নিজেই উকিল ঠিক করলাম। কেস ফাইল করলাম।বাড়িতে বলেছি আমার জন্য তোমাদের কোনও চিন্তা করতে হবে না আমি নিজের ব্যবস্থা করে নেব রোজ রোজ একজনের কাছে লাঞ্ছিত হওয়ার চেয়ে মনে হয় বাইরে বেরিয়ে সংগ্রাম করা ভালো। বাড়ির লোক প্রথমে রাগ করেছিল তারপর আমার জেদের কাছে হার মেনেছে। "সৌভিকের বেশ ভালো লাগে দোলনের আত্মবিশ্বাস। কারও সমর্থন ছাড়াই ও এগিয়ে চলেছে। এই অল্প বয়সে মেয়েটা কি শুধু সৌভিকের কথাতেই আত্মবিশ্বাস পেয়েছে! না কি দোলনের মনের বল সত্যি অসামন্য। সচারচর মেয়েরা এত সাহস পায় কোথায় যখন বাড়িতে কোনো সাপর্ট থাকে না।




      একদিন দোকানে এক নব দম্পতি এসেেছ।বৌটিকে দেখেই মনে হচ্ছে নতুন বিয়ে হয়েছে। তার স্বামীটি তাকে পারফিউম কিনে দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল কিন্তু বৌটির কোনও গন্ধই পছন্দ হয় না। এদিকে স্বামীটিও ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।কিন্তু সে তো না না কারণ না না বাহানা দিয়ে চলেছে। কিছুতেই তার কিছু পছন্দ হয় না।শেষ মেষ কিছুই পছন্দ করতে না পেরে তারা একটি লিপস্টিক কিনল। এসব দেখে দোলন মুখ বেঁকিয়ে বলে ..."ন্যাকাম! নতুন বিয়ে হয়েছে তো তাই! দুদিন যাক হাড়ে হাড়ে টের পাবে।"সৌভিক হাসে ..."তুমি পাগল আছ।"
..."পাগল কেন হব! ঐ সব প্রেম ট্রেম আমার ঢং মনে হয় সব দুদিনের। "সৌভিক বলে ..."না গো প্রেম একটা অনুভূতি। মনের মানুষ যখন জীবনে আসবে তখন দেখবে আবেগ নিজে থেকেই প্রকাশ পাবে। "দোলন খুব হাসে ..."তোমার যেন তাই হয়! আমার সব আবেগ ফুরিয়ে গেছে। "
..."ফুরয় নি! মনে হয় ঘুমিয়ে পড়েছে। যত দিন বেঁচে আছ ততদিন আবেগ তোমার সঙ্গে থাকবে। "
..."তুমি এত ভালো ভালো কথা বল কি করে গো! কেউ আছে নিশ্চয়ই। "
..."তাকে খুঁজিনি।"

      দোলন মুখে হাত দিয়ে আশ্চর্য প্রকাশ করে বলে ..."খুঁজতে হয় বুঝি।"





     রাতে বিছানায় শুয়ে অন্ধকার ঘরে নীল রঙের নাইট ল্যাম্পের মধ্যে হঠাৎ দোলনের হাসি খুশি মুখটা দেখল সৌভিক। কি বয়স ওর মাত্র একুশ বছর। কখনও হা হা করে হাসে কখনও মন মরা হয়ে বসে থাকে। এতটুকু জীবনে যে আঘাত ও পেয়েছে তাতে হয়ত স্বপ্ন দেখতে ভুলে গেছে কিন্তু বাঁচতে তো হবে ওকে।স্বপ্ন ছাড়া বাঁচা যায়।সৌভিকের চোখে রঙীন স্বপ্ন।মনে অনেক ভালোবাসা আজ যেন হঠাৎ ওর সব ভালোবাসা দোলনকে দিতে ইচ্ছে করল।যদি জীবনে কেউ আসেই তবে দোলন কেন নয়।একদিন সৌভিক দোলনকে বলল ..."তুমি এত বড় জীবনটা একা থাকবে?"দোলন বলল ..."কি করব বল।"
..."আমার তোমাকে ভালো লাগে। আমি সোজা কথা বলতে ভালোবাসি আমায় বিয়ে করবে। "দোলন চোখ বড় বড় করে বলে ..."আমি ডিভোর্সি!"সৌভিক বলে ..."তুমি না বললেও আমি জানি। আমার তোমাকে ভালো লাগে। আমি মন্দ লোক নই এটা আমাকে যারা চেনে তারা প্রত্যেকেই বলে। তুমি আমায় বিশ্বাস করতে পার।"দোলন চোখ নামিয়ে নিল ..."জানি।অন্য লোক না বললেও আমি জানি। তাও মনে হয় আমার উপর তোমার খুব মায়া।তাই আমায় নিয়ে এত ভাবছ। "সৌভিক বলে ..."আমার তোমাকে খুব ভালো লাগে। তোমার কথা মনে পড়লে আমার মন ভালো হয়ে যায়। তোমার সঙ্গে যতক্ষণ থাকি মনে হয় সব কিছুর সঙ্গে আমি লড়তে পাড়ব অনেক কিছু করার উৎসাহ পাই। কি জানি যদি এটাই ভালোবাসা হয় তবে ভালোবাসা বলতে পার। "দোলন বলল ..."আমি অত কথা বলতে পারি না শুধু তোমার ভালো চাই আমার কথা ভেবে তুমি এমন সিদ্ধান্ত নিও না। "সৌভিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে দোলনকে জীবন সঙ্গী করবে। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে মাকে নিয়ে যিনি প্রেমই পছন্দ করেন না সেখানে দোলনের তো ডিভোর্স হয়ে গেছে। সমাজের সঙ্গে লড়া যায় কিন্তু  বাড়ির সঙ্গে বিশেষ করে মায়ের সঙ্গে লড়া তো বেশী কঠিন  ।
       



     একদিন মনে অনেক সাহস জুগিয়ে সৌভিক মাকে বলল ..."আমি একজনকে ভালোবাসি।" মা চোখ ছানা বড়া করে বলে ..."যা ভয় করতাম ঠিক তাই ঘটালি। সৌভিক আমি কিন্তু আগে যা বলেছিলাম এখনও তাই বলব আমি মত দেব না। "সৌভিক করুণ ভাবে মায়ের কাছে এসে মাকে জড়িয়ে ধরল ..."মা আমি তোমার শিক্ষায় মানুষ হয়েছি। ভালো মন্দ বিচার করতে তুমি আমায় শিখিয়েছ তবে আজ আমার পছন্দে তোমার বিশ্বাস নেই কেন? তুমি কি চাও না আমি যার সঙ্গে ভালো থাকব তাকে আমার জীবনে আনি। "মা ছেলের কথায়  কিছুটা নরম হল..."মেয়ে দেখে যদি আমার পছন্দ না হয় তখনও তুই জেদ করবি? "
..."জেদ কেন বলছ মা। যদি না চাও তাহলে তাকে কোনও দিনও আমার জীবনে আনব না কিন্তু আমাকেও তুমি অন্য কারও সঙ্গে বিয়ের জন্য ফোর্স করবে না। "বলে সৌভিক বেরিয়ে গেল। বৌদির কাছে মা শুনল মেয়েটি ডিভোর্সি। সারা দিন মাও কান্নাকাটি করে মুখ ভার করে শুয়ে রইল। দুপুরে সৌভিক ওর সঙ্গে দোলনকে বাড়ি নিয়ে এল। রোগা পাতলা চেহারার মেয়েটা ভয়ে জড় সড় হয়ে দাঁড়িয়ে। মা ওকে দেখে ভুরু কুঁচকে রইল। দোলন ওনার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল কিন্তু উনি কোনও কথা বললেন না। সৌভিক বলল ..."মা ও দোলন। মাত্র ঊনিশ বছর বয়সে ওকে বাড়ি থেকে বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল শুধু ছেলেটার ভালো চাকরি দেখে। কিন্তু দিনের পর দিন অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে ও ঐ বিয়ে থেকে বেরিয়ে আসে। আমি ওকে সম্মান করি। পছন্দ করি ও আমাকে খুব ভালো করে বোঝে।"সৌভিক না না ভাবে দোলনের গুণ ওর প্রতি ওর ভাবনা সবই বলে গেল মা কে। কিন্তু উনি গুম হয়ে বসে রইলেন।মাকে কোনও কথার উত্তর দিতে না দেখে দোলন বুঝল সৌভিকের মায়ের ওকে অপছন্দ।ও বললো..."আপনি নিশ্চন্তে থাকুন মাসিমা আমি সৌভিকের জীবনে আসব না।"বলে হাসি মুখে দোলন বেরিয়ে গেল। সৌভিক ভাবেনি মা এমন করবে। খুব খারাপ লাগল ওর। বলল ..."একটা বাচ্চা মেয়ের কাছে তুমি অনেক ছোট হয়ে গেলে মা। "
       




বেশ কিছুদিন পর দোকানে একদিন দোলন সৌভিককে বলল ..."তোমার দোকানে কাজ করে যা বেতন পেতাম সেখান থেকে বিউটিশিয়ান কোর্স করেছি। একটা পার্লারে চাকরি পেয়েছি। তোমার কাছ থেকে যা সাহায্য পেলাম তা কোনও দিনও ভুলব না। যদি একটা শেষ কথা রাখ.. "বলে আগ্রহের সঙ্গে সৌভিকের দিকে তাকিয়ে রইল দোলন। সৌভিক হাসল ..."তোমার শেষ কথা মায়ের ইচ্ছে মত বিয়ে।সেটা হবে না। তুমি চাও জোর করে কাউকে বিয়ে করে তার এবং আমার জীবনটা নষ্ট করি। "দোলন কোনো কথা বললো না। চলে গেল।




        দেড় বছর হতে চললো  সৌভিক একাই দোকান সামলায়। কেমন যেন চুপ চাপ হয়ে গেছে ও। দিন রাত দোকান আর বাড়ি।কথা কম বলে বাড়িতে প্রায় থাকেই না। দোলনও পার্লারের কাজে ব্যস্ত।পরিশ্রমী হওয়ায় সবাই ভালোবাসে ওকে তার উপর ওর হাতের কাজ ভালো। একদিন দোলন  পার্লারের কাজে ব্যস্ত ছিল তখন দেখে সৌভিকের মা ঢুকলেন ওদের পার্লারে। দোলন এক গাল হেসে বলল ..."মাসিমা আসুন কি করাবেন? "পার্লারের মালিক তন্দ্রাদিকেও দোলন জানাল ..."উনি আমার পরিচিত।ম্যাডাম ওনার পরিবারের আমার উপর অনেক দান। "সৌভিকের মাকে দোলন আবার খুব আপন ভাবে জিজ্ঞাস করল ..."বলুন কি করাবেন? "উনি দোলনের হাতটা চেপে ধরলেন ..."আমার আগের সৌভিককে ফিরিয়ে দিতে পারবে?"দোলন হকচকিয়ে যায়।সৌভিকের মা বললো ..."তোমাদের ছেলে মানুষ ভেবেছিলাম কিন্তু এতটা বয়স হয়েও মনের দিক থেকে পরিণত হতে পারি নি। বড় সংকীর্ণ ছিল মনটা। তোমাদের দেখে অনেক কিছু শিখলাম।এই বুড়ো বাচ্চাটাকে তোমরা মাফ করবে না!"দোলনের চোখের কোণে জল চলে এল।




       রাতে দোকান থেকে বাড়ি ফিরে সৌভিক দেখে ওর ঘরে মায়ের সঙ্গে বসে আড্ডা দিচ্ছে দোলন। ও অবাক হয়ে যায়। গত দেড় বছরে প্রায় কোনো যোগাযোগই ছিল না ওর সঙ্গে।বলে ..."তুমি? "মা বলো ..."কেন তোর মা বুঝি খুব খারাপ। দোলন আমার সঙ্গে এসেছে। "সৌভিক কিছুই বুঝতে পারে না।
 ..."আধুনিক যুগে এসে সেকেলের মানসিকতায় পড়ে ছিলাম।আমাকে তো তোরা সেখান থেকে বের করে আনলি।"বললো সৌভিকের মা।সৌভিকের মাথায় সস্নেহে হাত রাখলেন উনি..."আমি  সব সময় তোদের সুখ চাই। "সৌভিক মাকে জড়িয়ে ধরল।বুকটা হালকা লাগল হঠাৎ করেই। দোলন হাসি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে ।সৌভিকের মা হাত বাড়িয়ে ওকে কাছে ডেকে নিলেন। দোলন জড়িয়ে ধরল ওনাকে।সৌভিক এক ফাঁকে তাকাল দোলনের দিকে দোলনের হাতটা ধরল আস্তে করে। দোলন ওর দিকেই চেয়ে। বড্ড হালকা লাগছে দুজনেরই শরীর আর মন।কবে একদিন যেন মিলে গিয়েছিল ওদের মন। টের পাইনি কেউ। আজ আবার ফিরে পেল পুরনো ভালোলাগাটা।আবার ফিরে পেল দুজন দুজনকে।এবার পাকাপাকি ভাবে মিলে যাবে দুজনে। ©Pryamboda priya
অনুভূতির আসর-Anuvutir asor facebook page 

পুনরায় *


#পুনরায়
#রচনায় #(প্রিয়ম্বদাপ্রিয়া)
        ক্লাস ফোরের অঙ্ক দিদিমণি নবনীতা ব্ল্যাক বোর্ডে সরল বোঝাচ্ছেন।ছাত্র ছাত্রীরা সকলে ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে তাকিয়ে।নবনীতা যত্ন সহকারে ফার্স্ট,সেকেণ্ড,থার্ড ব্র্যাকেটের রহস্য উদ্ঘাটন করে চলেছে। লাস্ট বেঞ্চ থেকে হি হি খি খি আওয়াজ শুনে টেবিলে কাঠের ডাস্টার চাপড়ে চেঁচাল..."কি হয়েছে.. মুখে আঙুল দিয়ে বস।"পিছন বেঞ্চ থেকে ছোট্ট খাট্টো একটি মেয়ে এগিয়ে এল ..."দিদিমণি দীপমাল্য আমায় এই চিঠিটা দিয়েছে।"ওর ছোট্ট হাত থেকে দু ভাঁজ করা কাগজের টুকরটা খুলে দেখে ...ডেরা মৌটুসি আমি তোকে ভালাবাসি।তুই আমায় ভালাবাসিস।"প্রচণ্ড হাসি পেল অসাধারণ  বানানের প্রেম পত্রটা দেখে বিশেষত ইংরেজি শব্দ ডিয়ার এর বিকৃত রূপ ডেরা।ও কোনও রকমে হাসি সংবরণ করে চোখ পাকিয়ে বলল ..."দীপমাল্য.. বেঞ্চের উপর উঠে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাক।স্কুলে পড়তে এসে এই সব হচ্ছে।"দীপমাল্য টুকুস করে কান ধরে স্মার্টলি বেঞ্চের উপর উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল।ক্লাস ফোরের বছর আটের এই প্রেমিকটিকে দেখে খুব হাসি পাচ্ছিল নবনীতার।




      টিফিনের সময় টিচারস রুমে ঢুকে দেখে সকলে হাসি ঠাট্টা করছে। গায়ত্রী দিদিমণি মন দিয়ে রাজমা রুটি খাচ্ছেন। রেবা দিদিমণি ফোনে বরের সঙ্গে মিষ্টি প্রেমালাপে মগ্ন। আজকের ক্লাসের ঘটনাতে নবনীতারও মনে পড়ে গেল ওর ছোটবেলার কথা।তখন ক্লাস টু।ও আর রণজয় সব সময় এক সঙ্গে ঘুরত। এখনও নবনীতার পরিষ্কার মনে আছে রণজয়ের ফর্সা টুকটুকে গোলগাল চেহারাটা। একদিন রণজয় বলেছিল নবনীতা চল তুই আর আমি বিয়ে করে নি তাহলে আমরা সব সময় এক সঙ্গে থাকতে পারব। কেউ আলাদা করতে পারবে না। নবনীতাও এক মুহূর্ত দেরি না করে ওর প্রস্তাবে রাজি হয়ে ঘাড় নেড়ে বলেছিল ..."এখুনি বিয়ে করেনি চল।"ব্যস মিঞা বিবি রাজি তো ক্যায়া করেগা কাজি! দুজনে একে অপরের ওয়াটার বোতল দিয়ে মালা বদল  সেরে নিয়েছিল।আমাদের বিয়ে হয়েগেল বুঝলি বলেছিল রণজয়।এখন ভাবলে সত্যি হাসি পায়।রণজয় তো ক্লাস ফোরের পর স্কুল ছেড়ে চলে গিয়েছিল।তারপর আর দেখাই হয়নি ওর সঙ্গে। তবু স্মৃতিতে রয়েগেছে শৈশবের নরম দিন গুলোর কথা।
     



       বাড়ি ফেরার পথে আজ আবার ব্যঙ্কে যাওয়ার কথা।এই শনি রবি পর পর ব্যঙ্ক বন্ধ।ব্যঙ্কে ঢুকে ক্যাশ কাউন্টারে চেকটা জমা দিতে ক্যাশ কাউন্টারের অল্প বয়সী ছেলেটি নবনীতার মুখের দিকে দু বার তাকাল। তৃতীয় বার তাকাতে নবনীতার খুব বিরক্ত লাগল। ছেলেরা মুখের দিকে হাঁ করে তাকালে ওর খুব রাগ হয়।ও বলল ..."সই মিলছে না নাকি? "ছেলেটি মৃদু হেসে বলল ..."না না ঠিকাছে।"নবনীতা গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।বাড়িতে আজ আবার বড় মাসির আসার কথা। বড় মাসির মেয়ে তিন্নি আর ও একই বয়সী। তাই আজকে ওর মনটা বেশ চঞ্চল।কখন বাড়ি যাবে আর তিন্নির সঙ্গে আড্ডা জুড়বে সেই কথা ভাবছে ক্ষণে ক্ষণে।বাড়িতে ঢুকেই অতিথিদের দেখতে পাবে। বাড়ি যেতে যেতে নবনীতার দুপুর হয়ে যায়।সকালে স্কুলের এই এক সুবিধে দুপুরের ভাত খেয়ে একটু ঘুমানো যায়। কলিং বেল বাজাতেই দরজা খুলে তিন্নি লাফা লাফি শুরু করল..."কত দেরি করলি! আজ স্কুলে না গেলেই হত।সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছি।"বড় মাসি ওকে বকল ..."দাঁড়া মেয়েটাকে একটু বিশ্রাম নিতে দে। সবে বাড়িতে ঢুকেছে।"




     স্নান সেরে দুপুরে সকলের সঙ্গে গল্প করে খাওয়ার আনন্দই আলাদা। তিন্নি আবার ওদের বাড়ির গাছের গন্ধরাজ লেবু নিয়ে এসেছে। মুসুড়ির ডাল গন্ধরাজ লেবু দিয়ে মেখে ভাতের গরস মুখে পুরে নবনীতা চোখ বুজে বলল ..."তিন্নি কি বুদ্ধি করে এনেছিস আর কিছু লাগে না।মা মাংস তুলে নাও আমি এই দিয়েই খাব।"বড় মাসি রসিকতা করে বললো..."ওরে তোর বরের অনেক পয়সা বাঁচবে। শুধু ডাল ভাত খেয়ে থাকবি আর আমরা তোর বিয়েতে একটা গন্ধরাজ লেবুর গাছ দিয়ে দেব।"নবনীতা বললো ..."প্লিজ মাসি ঐটে দিয়োই। ঐ গন্ধরাজ লেবু গাছ আমার চাই। নইলে আমি বিয়ের পিঁড়িতেই বসব না। "তিন্নি পাশ থেকে ফোড়ন কাটল ..."আর যদি তোর বরের গন্ধরাজ লেবুতে অ্যালার্জি থাকে। মানে ধর গন্ধটা সহ্য হয় না এমন কোনো ব্যাপার স্যাপার হলে? "
..."ক্যানসেল! সোজা বিয়ে ক্যানসেল করে দেব!"মা ধমকাল ..."ঠিকাছে ঠিকাছে তখন নয় দেখা যাবে। লেবুর জন্য বিয়ে ভাঙছে। যত সব পাগলের প্রলাপ।"
..."পাগলামী নয় মা।আমি কেন স্যক্রিফাইস করব?"
..."চুপ করবি! পাগল একটা উফ! দেখত দিদি! "বড় মাসি হাসছে মিটি মিটি।




খাওয়া দাওয়া সেরে দুই বোন সারা দুপুর আড্ডা দিল।সন্ধের দিকে  নবনীতা বলল ..."চল ফুচকা খেয়ে আসি।মেন রোডের ধারে ঐ বটতলার নীচের ফুচকাওয়ালাটা দারুণ বানায়।"তিন্নিও উঠে পড়ল। নবনীতার কানের কাছে এসে বললো ..."ফুচকার জলে গন্ধরাজ লেবু দেয় তো!"ওর কথায় হেসে উঠল ওরা দুজনেই। সেজে গুজে বেরল দুই বোন।বটতলার নীচের ফুচকাওয়ালা সামনে দাঁড়িয়ে দুজন।শালপাতা হাতে  দুজনের দৃষ্টি ফুচকার দিকে হঠাৎ একজন নবনীতার পাশে এসে দাঁড়াল।ফুচকাওয়ালা তার দিকে শাল পাতা এগিয়ে দিতে নবনীতা তাকিয়ে দেখে ব্যঙ্কের যুবকটি। সঙ্গে সঙ্গে নবনীতার ফুচকা খাওয়ার ইচ্ছেটাই চলে গেল। মনে মনে রাগ হল। ভাবল বড্ড ত্যাঁদড় ছেলে তো! সকালেও মুখের দিকে বার বার  তাকাচ্ছিল। এখন আবার পাশে দাঁড়িয়ে ফুচকা খেতে চলে এল। নবনীতা কয়েকটা খেয়ে বলল ..."আর দিতে হবে না।"তিন্নি বলে ..."কেন রে ভালো মেখেছে তো !আরও কয়েকটা খা।"নবনীতা দেখে ছেলেটি মুচকে হাসছে আর বার বার তাকাচ্ছে ওর দিকে। নবনীতার আরো বিরক্ত লাগল। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে গায়ে পড়ে ভাব করতে চাইছে। ও বলল ..."চল আর খেতে হবে না। "
   




         রাত্রে বেলায় নবনীতা আর তিন্নি আবার জমিয়ে আড্ডায় বসল। না না হাসি ঠাট্টার মাঝে তিন্নি পুরনো দিনের অনেক কথা বলছিল।ওদের ছোটবেলার কথা। তিন্নি বললো ..."মনে আছে নবনীতা তুই একবার  দৌড়াতে গিয়ে চৌকাঠে হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়েছিলি।ভুরুর  উপর তোর কি জোর চোট লেগেছিল।"নবনীতা নিজের ভ্রূতে হাত দিয়ে তিন্নিকে দেখাল ..."এই দেখ না সেই চিহ্ন এখনও বয়ে চলেছি। তিনটে স্টীচ পড়েছিল।"
..."হুম। দাগটা যায়নি বল! "
..."না! "বলে নবনীতা খাটে শরীরটাকে এলিয়ে দিল।রাত্রে বেলার মেঘহীন পরিষ্কার আকাশ। কালো আকাশটার বুকে তারা গুলো চক মক করছে।দূর থেকে জানান দিচ্ছে আমরা আছি আমরা থাকব! একটা ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে।যেন সঙ্গে নিয়ে আসছে কত স্মৃতি কত গন্ধ কত কথা। এমন সুন্দর পরিবেশে মনটাও একটু ভাবুক হয়ে পড়ে।তিন্নিকে নবনীতা জিজ্ঞেস করল ..."তুই প্রেমে বিশ্বাস করিস ? "তিন্নি বললো ..."তুই করিস না। "নবনীতা চুপ করে রইল। তিন্নি বললো ..."তুই যা সবার উপর কর্তৃত্ব ফলাস। তোর তো একদম শান্ত শিষ্ট পাত্র চাই। "বলেই তিন্নি মুখ চেপে হেসে বলল ..."তোর তো আবার মোচওয়ালা ছেলে পছন্দ নয়। দেখবি তোর কপালে ঐ মোচই জুটবে। "নবনীতা বেদম চটে ..."এমন অভিশাপ দিতে হয়? আমি কিছুতেই ঐ গোঁপওয়ালা ছেলেকে বিয়ে  করব না। "তিন্নি ওর মুখ চোখ দেখে হাসতে হাসতে খাটে শুয়ে পড়ল। নবনীতা বলল ..."জানিস আজ ব্যঙ্কে একটা গোঁপওয়ালা ছেলে হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল! এত বদমাশ আজ ফুচকা খেতেও দেখি ঠিক পাশে এসে দাঁড়িয়ে।ওর কথায় আবার হাসে তিন্নি ..."দেখবি তোর ঠিক গোঁপওয়ালা ছেলেই জুটবে।"
..."বলিস না তিন্নি! "নাকি সুরে বললো নবনীতা।
       




        বড় মাসিরা চলে যাওয়ার পর বাড়ি আবার ফাঁকা। নবনীতাও ওর রোজকার রুটিনে ব্যস্ত।সকালে উঠে স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল।তখন মা ডাকল চেঁচিয়ে ..." এদিকে আয় নবনীতা তোর বাবার শরীরটা কেমন করছে। "নবনীতা ছুট্টে পাশের ঘরে গিয়ে দেখে বাবা খাটে শুয়ে ছটফট করছে। মায়ের মুখ চোখ কালো। মা বলল ..."কাল মাঝ রাত থেকে তোর বাবার পেটের কোণায় ব্যাথা ছিল। কদিন ধরে কোমর পিঠেও ব্যাথা।কাল দুবার বমিও করেছে।এখন আর ব্যাথা সহ্য করতে পারছে না।" নবনীতা ভয় পেয়ে যায়। অস্থির হয়ে পড়ে।মা কে বলে ..."রাতে আমাকে ডাকনি কেন? "বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে জিগ্যেস করে ..."খুব কষ্ট হচ্ছে বাবা। "বাবা ব্যথায়া কিছুই বলতে পারল না।মুখ চোখ ব্যথায় কালো হয়ে গেছে। নবনীতা সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারকে ফোন করায় উনি লক্ষণ গুলো শুনে বললেন মনে হয় গল ব্লাডারের স্টোনের ব্যথা। ইমিডিয়েট হসপিটালাইজড করতে হবে।"বাড়িতে যা টাকা ছিল তাই দিয়ে নবনীতা মাকে বলল তুমি বাবাকে নিয়ে হসপিটালে যাও আমি এ.টি.এম থেকে  টাকা তুলে আনি। "বাড়িতে অ্যম্বুলেন্স এল পাশের বাড়ির হীরক কাকু বলল ..."চলুন আমিও সঙ্গে যাই। "নবনীতাও একটু সাহস পেল।নইলে একা মাকে অ্যাম্বুলেন্সে অসুস্থ বাবার দায়িত্বে পাঠাতে ভয় হচ্ছিল। বাড়ি থেকে তড়িঘড়ি বেরিয়ে ছুটতে ছুটতে এ.টি.এম এ ঢুকে টাকা তুলতে গিয়ে কিছুতেই টাকা তুলতে পারে না। বার বার এ.টি.এম ম্যাশিনের স্ক্রীনে 'এরর' ম্যাসেজ ফুটে উঠেছে। টেনশনে নবনীতার কপাল মাথা ঘামে ভিজে যায় কিছু বুঝতে না পেরে আবার ব্যাঙ্কে ছোটে। ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারে এ.টি.এম কার্ড রিনিউ করা হয়নি। তখন খেয়াল হল অনেক দিন ধরেই গাফিলতি করে কার্ডটা রিনিউ করতে আসা হয়নি। এদিকে তাড়াহুড়োয় সঙ্গে পাশ বইটাও আনেনি। এমন সময় হীরক কাকু ফোন করে বলল ..."নবনীতা তাড়া তাড়ি এস টাকা জমা না করলে নার্সিংহোম ভর্তি নিতে চাইছে না। "এমন একটা চাপের পরিস্থিতিতে নবনীতার মাথা কাজ করছিল না খুব কান্না পাচ্ছিল। ওর চোখ মুখ লাল পুরোপুরি বিধ্বস্ত অবস্থা।তখনই সেই ক্যাশ কাউন্টারের ছেলেটি ওর কাছে ছুট্টে এসে বলে ..."কি হয়েছে? "নবনীতা মুখ কাঁচুমাচু করে সব বলল। ছেলেটি বলল ..."কোনও টেনশন নিতে হবে না আমি সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।"নবনীতা বলল ..."আমি পাশ বই চেক বই কিচ্ছু  আনিনি।তাড়াহুড়োয় শুধু এ.টি.এম কার্ডটা নিয়ে এসেছি।আমার অ্যাকাউন্ট নাম্বার মনে থাকে না। আমি কিছুই বলতে পারব না।"ছেলেটি বলল ..."নিশ্চিন্তে থাকুন।"ছেলেটি নবনীতার এ.টি.এম কার্ড থেকে অ্যাকাউন্ট নাম্বার বের করে টাকা তোলার ব্যবস্থা করল। টাকা পেয়ে নবনীতা  বলল ..."আপনি অনেক সাহায্য করলেন।"টাকা ব্যাগে পুরে ও ব্যঙ্ক থেকে বেরবে ঠিক তখন  ছেলেটি বলল ..."এত গুলো টাকা নিয়ে বিপদের সময় আর একা যাবেন না।আমি আপনার সঙ্গে যাচ্ছি চলুন।"এক পলক নবনীতা তাকাল ছেলেটির দিকে। অবাক হল। এখনও কেউ বিনাসার্থে কারো জন্য কিছু করে!




টাকা নিয়ে হাসপাতাল পৌঁছতে বাবার অ্যডমিসন হল। ছেলেটি হসপিটালের সব ফর্ম্যালিটি করল। বিকেলে অপারেশন হল নবনীতার বাবার। নবনীতা ছেলেটিকে বলল ..."আপনার উপকার কোনও দিনও ভুলব না। "ছেলেটি বলল ..."ওসব কথা এখন থাক।"




     দুদিন পর নবনীতার বাবা পুরোপুরি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেন। নবনীতার মনে হল একবার ব্যাঙ্কে গিয়ে লোকটার সঙ্গে দেখা করা উচিত। যতই মুখের দিকে হাঁ করে তাকাক ও সেদিন অনেক সাহায্য করেছে। তাই একটা ধন্যবাদ তো জানাতেই হয়! সেই মত ব্যাঙ্কে গিয়ে সেই অপরিচিত যুবকটিকে বলে ..."সে দিন আপনি আমায় বিরাট বিপদ থেকে বাঁচিয়েছিলেন। আমি যে কি বলে আপনাকে ধন্যবাদ জানাব বুঝে উঠতে পারছি না।" ছেলেটি বলল ..."আমার সঙ্গে এক কাপ চা খেয়ে ধন্যবাদ জানাতে পারেন।"নবনীতা মুচকি হাসল। বললো ..."চলুন তবে তাই যাই! "
       




     দুজনে এক সঙ্গে ক্যঁফেতে বসে।চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ছেলেটি বলল ..."আমার নাম রণজয়।তুমি বোধ হয় আমাকে ঠিক চিনতে পারনি।"আপনি থেকে তুমি বলাতে এবং চিনতে না পারার কথায় নবনীতা  ভুরু কুঁচকে তাকাল।আজব ব্যাপার এ হঠাৎ তুমিতে নেমে এল কেন!আবার বলে কি না চেনে!রণজয় বলল ..."সেদিন যখন চেক জমা দিতে এসেছিলে তখন নবনীতা দত্ত নামটা দেখে তোমার দিকে তাকাই।ভালো করে দেখতে দেখলাম ভুরুর উপর কাটা দাগটাও আছে। সেই দিনই চিনেছি।তোমার মুখটা কিন্তু খুব একটা বদলায়নি। "নবনীতা অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে। রণজয় বলে ..."এখন যদি আমাদের বিয়েটা অস্বীকার কর আমার কিছু করার নেই। "
নবনীতা বলল ..."বিয়ে?আপনি কি পাগল? "
..."ও! তবে ভুলে গেছ! "বলে রণজয় চায়ের কাপে চুমুক দিল।ওর চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার ভঙ্গিতে যেন কিছু মনে পড়ল নবনীতার। চোখ ছোট করে তাকাল রণজয়ের দিকে তারপর মুখে হাত দিয়ে বলে ..."রণজয়... রণজয় বসু... সরস্বতী বিদ্যামন্দিরের রণজয় বসু। "রণজয় চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে বললো ..."হুম! তোমার বর রণজয়ও বলতে পার! তাহলে বেশী খুশি হতাম।এখন যদি বল আমাকে পছন্দ হচ্ছে না তাহলে আমার কিছু করার নেই।"নবনীতা মুখ চেপে হাসে।বলে ..."তোমার মনে আছে সেই কোন ছোট্ট বেলার কথা।"
..."প্রথম বিয়ে কি কেউ ভোলে! কবে থেকে বউটাকে খুঁজছিলাম অনেক খুঁজে যখন  পেলাম তখন সে  তো আমাকে দেখলেই ফোঁস করে ওঠে। আমি কত চেষ্টা করি কিন্তু তোমার কাছে আসতে তুমি যা রেগে যেতে তা তোমার মুখ চোখ বলে দিত।"বলে হাসল রণজয়।তারপর বললো ..."তা এখন বল আমার শ্বশুর মশাই কেমন আছেন? "নবনীতা চোখ সরু করে বলে ..."তুমি নিশ্চিত। আমি তোমায় হাজবেন্ড হিসেবে মেনে নেব। "রণজয় হতাশ ভাবে বলল ..."ও, মেনে নেবে না। "নবনীতা ওর মুখ দেখে হেসে ফেললো।ওর গোঁপের দিকে আঙুল তুলে বললো ..."আমার গোঁপ পছন্দ নয়। "
..."এই গোঁপটার জন্য তুমি পুরো মানুষটাকে রিজেক্ট করে দেবে।"বলে চোখ বড় বড় করে তাকাল রণজয়। খুব হাসল নবনীতা।বললো ..."না রিজেক্ট করব না। আমার ছোট্ট গোল গাল রণজয়কে যতটা পছন্দ ছিল এই কদিনে এই গোঁপওয়ালা রণজয়কেও ততটাই পছন্দ হয়েগেছে।"©Pryamboda priya
অনুভূতির আসর-Anuvutir asor

শনিবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৮

যখন_দূরে গেলে*

#ক্ষণিকের_দূরত্ব
#রচনায়#রিমা_বিশ্বাস( প্রিয়ম্বদা_প্রিয়া)
         আয়ুষীর কলেজের চিত্ররূপের উপর ক্রাশ।ওর কানের পাশের লম্বা জুলফি, ওর চুলের কায়দা, ওর পেটানো চেহারা ভীষণ আকর্ষণ করে আয়ুষীকে। যখনই চিত্ররূপ ওর সামনে আসে আয়ুষী এক ফাঁকে ঠিক দেখে নেয় ওকে।ওর বন্ধুরা সবাই জানে আয়ুষী পছন্দ করে চিত্ররূপকে।একদিন ক্লাসে অরুন্ধুতী বলল..."চিত্ররূপ তোর কথা জিগ্যেস করছিল।"কথাটা শোনামাত্র ওর হার্টবিট বেড়ে গেল ও উত্তেজিত ভাবে বলে ..."কি জিগ্যেস করছিল?"অরুন্ধুতী সামনের দিকে তাকিয়ে ওকে চাপা স্বরে বলল ..."ক্লাসের শেষে বলব ম্যাম দেখলে ঝাড় খাব।"আয়ুষীর আর ম্যামের 'মিরর ইমেজ' এর ক্লাসের কিছুই মস্তিষ্ক গোচর হল না।মনে হল কখন ক্লাস শেষ হবে আর ও অরুন্ধুতীর কথা শুনবে। ম্যামের লেকচার আজ বড়ই বোরিং  হচ্ওছিলর এবং সারাক্ষণ ক্লাস শেষ হওয়ার অপেক্ষায় বসে রইল।বেল পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আয়ুষী বেশ উৎফুল্ল হয়ে উঠল।ম্যাম বেরিয়ে যেতেই ও অরুন্ধুতীকে জিগ্যেস করল..."কি বলছিল চিত্ররূপ?"অরুন্ধুতী বলল ..."তোর নাম জানতে চাইছিল?''আয়ুশী আগ্রহী ভাবে ওর দিকে তাকিয়ে রইল।অরুন্ধুতী আর কিছু বলছে না দেখে আয়ুষী আবার জিগ্যেস করল ..."ব্যাস আর কিছু না।"অরুন্ধুতী বলল ..."না।"শুনে একটু নীরাশই হল মেয়েটা।ফর্সা রোগা পাতলা চেহারার আয়ুশীর জীবনে প্রথম কাউকে এতটা ভালো লেগেছে।স্কুল জীবনের ওর পছন্দের হিরো ছিল স্পাইডার ম্যান রাত্রে বেলা স্পাইডার ম্যানকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেছে।বর্তমানে স্পাইডার ম্যান ওর মানসপট থেকে ফিকে হয়েগেছে এখন চিত্ররূপ বর্ণময় হয়ে ওর স্বপ্ন রাজ্যে বিচরণ করে।কলেজ থেকে বেরবার সময় একদিন অরুন্ধুতী বলল ..."চিত্ররূপ তোর জন্য কলেজের বাইরে অপেক্ষা করছে।"আয়ুষী ওর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে ..."তুই চল আমার সঙ্গে।"অরুন্ধুতী বলে ..."অসম্ভব তোদের মাঝে আমি নেই তুই একা যা।"আয়ুষী বেশ উত্তেজিত হয়ে ওর সঙ্গে দেখা করতে গেল।হৃদস্পন্দনের গতিবেগও বৃদ্ধি পেয়েছে। চিত্ররূপ ওকে দেখে মিষ্টি করে হাসল।খানিক্ষণ দুজনেই নীরব।তারপর চিত্ররূপ বলল ...."তোমাকে আমার বেশ ভালো লাগে বন্ধুত্বের আগেও আমি তোমার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চাই।"বলে আবার চিত্ররূপ ওর দিকে তাকিয়ে রইল। আয়ুষী লাজুক ভাবে বলল ..."আই অলসো লাইক ইউ।"ফিজিক্সের আয়ুষীর সঙ্গে কেমিস্ট্রির চিত্ররূপের রাসায়নটা এভাবেই শুরু হয়।চিত্ররূপ নিজে আয়ুষীকে প্রপোজ করবে ভাবলেই বিষয়টা বেশ উপভোগ করে আয়ুষী।চিত্ররূপ ওর ব্যাপারে বেশীই পজেসিভ আয়ুষী তা লক্ষ্য করেছে এটা ভেবে একটু বেশীই ভালো লাগে ওর।চিত্ররূপের প্রত্যাশাও ওর প্রতি খুব বেশী।আয়ুষীকে ফোনে যদি কোনও সময় না পায় চিত্ররূপ সঙ্গে সঙ্গে রেগে যায় তাই আয়ুষী সব সময় তটস্থ থাকে।সেদিন ফোনটা সাইলেন্ট ছিল আয়ুষী মন দিয়ে প্র্যাকটিকাল খাতায় নোট লিখছিল চিত্ররূপ সাত বার ফোন করেও ওকে পায় না।রাত্রে বেলায় শোবার সময় আয়ুষী মোবাইল চেক করে দেখে সাতটা মিসড কল।সঙ্গে সঙ্গে ও চিত্ররূপকে কল ব্যাক করে কিন্তু চিত্ররূপ ফোন ধরে না আয়ুষী  অনেক গুলো ম্যাসেজ পাঠায় ও তারও উত্তর দেয় না আয়ুষী দেখতে পাচ্ছে চিত্ররূপ অন লাইনে তবু ওকে রিপলাই করছে না।পরের দিন কলেজে গিয়েও চিত্ররূপ ওর সঙ্গে কথা বলল না। আয়ুষী মন খারাপ করে ক্যন্টিনে বসে।অরুন্ধুতী ওকে বলে ..."তুই চিত্ররূপকে এত ভয় পাস কেন? তুই  কি ইচ্ছে করে ওর ফোন ধরিস নি? ও কেন এত ওভার রিয়াক্ট করছে?"আয়ুষী তো চিত্ররূপের বিরুদ্ধে কিছুই শুনতে নারাজ ও বলল ..."ওর স্বভাবটাই ঐ রকম ছোট খাটো ব্যাপারে অভিমান হয়ে যায়।"অরুন্ধুতী খুব বিরক্ত হয় ..."অসহ্য... আমি হলে এমন ছেলের সঙ্গে জীবনে কথা বলতাম না।"সারা দিন চিত্ররূপ ওর সঙ্গে কথা বলল না আয়ুষী অনেক চেষ্টা করেও ব্যার্থ।অরুন্ধতীর ওকে দেখে খুব রাগ হয় ও বার বার বোঝায় ..."চিত্ররূপ মোটেও তোকে ভালোবাসে না।যদি ভালোবাসত তাহলে সামান্য কারণে এত মেজাজ করত না।"আয়ুষী কিছুই শুনতে চায় না ও শুধু চিত্ররূপের সঙ্গে কথা বলতে চায়। বাড়ি ফিরে আবার ওকে ফোন করল।চিত্ররূপ ফোন ধরায় আয়ুষী উৎফুল্ল হয়ে বলে..."রাগ কমল।"চিত্ররূপ ভারি গলায় বলে ..."এতবার ফোন করতে হয় কেন তোমাকে? "মিষ্টি করে আয়ুষী জানায় ..."আর এরকম হবে না।কিন্তু তুমি আমার সঙ্গে কথা বন্ধ করলে আমি পড়ায় মন দিতে পারি না। প্লীজ আমার সঙ্গে এমন কর না"              চিত্ররূপের মান ভঙ্গ হওয়ার পর আয়ুষী বেশ খোশ মেজাজে আছে।একদিন ক্লাসে  অ্যাটোমিক ফিজিক্সের বইটা মুখের সামনে খুলে বসে আছে যদিও পড়ার নামে বন্ধুরা বেঞ্চের এদিক ওদিক বসে আড্ডাই দিচ্ছিল।জয়দেব হঠাৎ ওর বইটা হাতে নিয়ে বলল ..."এই বইটা কবে থেকে খুঁজছিলাম।কাল ফেরত দিয়ে দেব।"আয়ুষী বলল ..."কোনও ভাবেই দিতে পারব না চিত্র আমার কাছে চেয়েছে।"জয়দেব বলল..."আজ চিত্ররূপ কলেজেই আসেনি।কাল আমি কলেজে বইটা নিয়ে আসব তুই তখন ওকে দিয়ে দিস।''আয়ুষী ওর কথায় রাজি হয়ে যায়।জয়দেব বরাবর ওকে না না ভাবে নোট দিয়ে সাহায্য করে তাই ও আর জয়দেবকে মানা করতে পারল না।বাড়ি ফিরে দেখে সবাই সিনেমা যাওয়ার প্ল্যান করেছে।আয়ুষী সঙ্গে সঙ্গে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়ল।বেশ রোম্যান্টিক মুভি। সিনেমা দেখতে দেখতে আয়ুষীর বার বার মনে পড়ল চিত্ররূপের কথা।হিরো যখনই হিরোইনকে না না ভাবে খুশি করার চেষ্টা করছিল আয়ুষীর মনে হচ্ছিল যদি চিত্ররূপ ঐ রকম করে ওকে এতটা গুরুত্ব দিত।বাড়িতে এসে নিজের ফাঁকা ঘরে খুব ইচ্ছে হল ওর সঙ্গে ফোনে একটু  কথা বলার।ও সমানে চিত্ররূপকে ফোন করে গেল কিন্তু চিত্ররূপ ফোন ধরল না।খুব রাগ হল আয়ুষীর ভাবল ও রিংব্যাক করলে কিছুতেই ফোন ধরব না।মুখ ভার করে ফোনটা হাতে নিয়ে বক্স জানলার ভিতরে ঢুকে বসল।রাত্রে বেলার সময় চারিদিক নিস্তব্ধ আকাশের মেঘের মাঝে আঁধখানা চাঁদটা মাঝে মধ্যে উঁকি মেরে আবার মেঘের মধ্যে লুকিয়ে যাচ্ছে।এমন একটা প্রেমময় বাতাবরণে ফোন করল চিত্ররূপ।আয়ুষী হাজার চেষ্টা করেও ওর ফোনটা রিসিভ না করে থাকতে  পাড়ল না..."কতবার ফোন করলাম ধরলে না কেন? "
..."শুনতে পাইনি।"
..."আমি না ধরলে রাগ কর কেন? "
..."তুমি তো সব সময় ফোন নিয়ে ঘুরে বেড়াও তাই ফোন না ধরলে রাগ হয়।"আয়ুষী খুব আল্হাদ করে বলল ..."আজ একটা সিনেমা দেখলাম।খুব ভালো লাগল সিনেমার হিরোটা ওর হিরোইনকে কি ভালোবাসত।তুমি কখনও আমাকে অত গুরুত্ব দাও না।"চিত্ররূপ নীরস ভাবে বলল ..."ওগুলো মুভিতেই হয় রিয়েল লাইফে হয় না।"
            পরদিন কলেজে ঢুকেই চিত্ররূপ বলল ..."অ্যাটোমিক ফিজিক্সের বই কোথায়? "আয়ুষী বলে ..."জয়দেব আসুক ওর কাছে আছে।"চিত্ররূপ বিরক্ত হয়ে বলে..."আমি চেয়েছিলাম তুমি জয়দেবকে দিলে কেন? "আয়ুষী খুব চিন্তায় পড়ে যায় জয়দেব না এলে আজ চিত্ররূপকে ক্ষান্ত করা মুশকিল।আয়ুষী ব্যাকুল হয়ে জয়দেবের অপেক্ষা করতে লাগল কিন্তু জয়দেব এল না। আয়ুষী মনে মনে জয়দেবকে দোষারোপ করল কথার দাম নেই এদের উপর বিশ্বাস করলে মুশকিলেই পড়তে হয়।কাঁচু মাচু হয়ে চিত্ররূপকে বলে ..."সরি,চিত্র বইটা আমি কাল ঠিক এনে দেব।"ব্যাস চিত্ররূপ সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরিত হয়ে উঠল ..."তুমি আমার সঙ্গে কোনও কথা বলবে না আমার তোমার এই দায়িত্ব জ্ঞানহীনতা একদম পছন্দ নয়।"বলেই ও খুব রূঢ় ভাবে পাশ কাটিয়ে চলে যায়।অরুন্ধুতী সব খেয়াল করেছে ও বলে..."তুই কি ওর দাস যে ও যা বলবে তা না করলেই ও মেজাজ দেখাবে আমি বুঝি না এটা তোর কেমন ভালোবাসা।"আজকের ব্যবহারে আয়ুষীও খুব আহত হয়।রোজ রোজ চিত্ররূপকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে কোথায় যেন ওর নিজের ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে আগে কখনও কারও ভালোলাগা বা ভালো না লাগা নিয়ে ও এতটা ভাবেনি।তাই ভাবল হয়ত ওর সঙ্গে দূরত্ব রাখাই ঠিক চিত্ররূপকে ও ভালোবাসে কিন্তু চিত্ররূপ ওকে মোটেও ভালোবাসে না।আয়ুষী ধীরে ধীরে নিজেকে ওর কাছ থেকে সরিয়ে নিল।চিত্ররূপকে ও ফোন করে না চিত্ররূপও কোনও সময় ওকে ফোন করে না।কলেজে দেখা হলে দুজনে অচেনা মানুষের মতনই আচরণ করে।
          একদিন কলেজে বাবাই আর জয়দেবের মাঝে সামান্য একটা বিষয় নিয়ে তর্কাতর্কি বাঁধে।আই.পি.এল-এর দুটো টিম নিয়ে কোন টিম বেস্ট সেই বিষয় যে যার অভিমত প্রকাশ করতে গিয়ে শুরু হয় তর্ক এবং তর্ক পরিণত হয় ঝগড়ায়।দুজনে উত্তেজিত হয়ে একে অপরকে ধাক্কা ধাক্কি শুরু করেছে।আয়ুষী ওদের মাঝে মধ্যস্থতা করতে যায় কিন্তু অসফল হয়। আয়ুষী জয়দেবকে কিছু বলতে যাবে জয়দেব ওকে অসতর্কবসত ধাক্কা দেয় আয়ুষী পড়ে গিয়ে ওর মাথাটা বেঞ্চের কোণায় লেগে কেটে সঙ্গে সঙ্গে রক্ত পড়তে থাকে।জয়দেব ভয় পেয়ে ছুট্টে যায় আয়ুশীর কাছে ওর মাথা দিয়ে তখনও রক্ত ঝড়ে পড়ছে।সব ছেলে মেয়েরা ঘিরে ধরেছে জয়দেব জলের বোতল থেকে জল নিয়ে রুমাল ভিজিয়ে ওর ক্ষত স্থানে বার বার  ধরছে ভয়ে অনুতাপে ওর মুখ চোখ শুকিয়ে গেছে।ভিড়ের মাঝে আয়ুষী দেখে চিত্ররূপ।হন্ত দন্ত হয়ে এসে ও আয়ুষীকে বলে ..."ঠিক আছ তুমি।"আয়ুষী কিছু বলার পরিস্থিতিতে নেই।চিত্ররূপ সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি বুক করে ওকে সোজা ডাক্তারের চেম্বারে নিয়ে যায়। ডাক্তারবাবু ড্রেসিং করে দিলেন ক্ষত বেশী গভীর না হওয়ায় স্টীচে প্রয়োজন হয়নি।আয়ুষী ওর আচরনে একটু অবাকই হয়।পরদিন কলেজে ঢুকতেই চিত্ররূপ ছুটে এসে বলে..."আজ কেন কলেজ এলে? কাল এতটা চোট লেগেছিল আজ রেস্ট নেওয়া উচিত ছিল।"আয়ুষী নির্বাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে।চিত্ররূপ আর কোনও কথা বলল না মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইল।আয়ুষী এগিয়ে গেল চিত্ররূপ ওর দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে।আয়ুষী দোতলা ওঠার জন্য সিঁড়ির দিকে এগল।সিঁড়িতে জয়দেবের সঙ্গে দেখা।ওকে দেখে জয়দেব অনুতপ্ত হয়ে বলল ..."আমার জন্য তোর এমন চোট লাগল।আমায় মাফ করে দে প্লীজ।"আয়ুষী হেসে বলে..."আমি জানি। তুই কি ইচ্ছে করে করেছিস ওটা একটা অ্যকসিডেন্ট ছিল।"চিত্ররূপ দ্রুত ওর কাছে আসে.."জয়দেব তোমায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল তাও ওকে হেসে হেসে বলছ ঠিকাছে কোনও অসুবিধে নেই।আমাকে একবারও বললে না চিত্র ঠিকাছে আবার আগের মতন হয়ে যাই চল।"জয়দেব মুচকে হেসে চলে গেল।আয়ুষী চুপ চাপ দাঁড়িয়ে চিত্ররূপ বলল ..."তুমি আমার সঙ্গে কথা বলতে না আমার খুব কষ্ট হত।"আয়ুষী আস্তে করে বলল ..."কখনও বল নি কেন? "
..."এখন তো বলছি।তোমার কপালে চোট দেখে আমি আর নিজেকে আটকাতে পারিনি।"আয়ুষী হাসল।চিত্ররূপ ওর মাথার ব্যন্ডেজে হাত দিয়ে বলল ..."ব্যথা।"আয়ুষী বলল ..."তুমি এত রুক্ষ ব্যবহার করলে আমি ব্যাথা পাই।"চিত্ররূপ বলল..."তুমি দূরে চলে যাওয়ার পর বুঝেছি তুমি আমার কাছে কত গুরুত্বপূর্ণ আমাকে তোমার মতন কেউ বোঝে না।আই লাভ ইউ আয়ুষী।স্বপ্নেও তোমাকে ব্যাথা দেওয়ার কথা ভাবব না।"©Pryamboda priya 
অনুভূতির আসর Anuvutir asor 

ইন্টারভিউতে সাক্ষাত*

#ইন্টারভিউতে_সাক্ষাত
#রচনায় #(প্রিয়ম্বদাপ্রিয়া)
        কল সেন্টারের ইন্টারভিউ চলছে নির্বাচিত কয়েকজন ক্যানডিডেট অপেক্ষারত। মোহনার বুকটা একটু ধুক পুক করছে আর পাঁচজনের পর ওর ডাক।ইনসট্যান্ট কোনও একটা টপিকের উপর অনর্গল ইংলিশের ঝড় তুলতে হবে। টাইট জিনস আর রেড টপে সামান্য উত্তেজিত মোহনাকে এক যুবক বেশ কিছুক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছিল। ওর পাশের চেয়ারে বসে একটু গলা ঝাঁকিয়ে সে বলল ..."টেক আ ডিপ ব্রেথ।"মৃদু হেসে মোহনা তাকায়।ছেলেটি বলে ...তুমি টেনশন নিচ্ছ এটা যেন ইন্টারভিউ কতৃপক্ষ বুঝতে না পারে। "মোহন বলল ..."এটা আমার ফার্স্ট ইন্টারভিউ। "ছেলেটি হাসল ..."আমারও...ওয়েল আমার নাম রাজ মিত্র।"





    মোহনার আগেই রাজের ডাক পড়ল। মোহনা মৃদু উত্তেজনায় অপেক্ষারত এবার ওর পালা।ও ভিতরে ঢুকে দেখে স্যুটেড বুটেড চারজন ব্যক্তি বসে। ওকে বলা হল মডার্ণ টেকনোলজি কি ভাবে আমাদের জীবনে প্রভাব ফেলেছে তার উপর একটা স্পীচ দাও।বেশ মনঃপূত টপিক মোহনা সুন্দর ভাবে বলে গেল তারপর প্রশ্নের রাউণ্ড। কাস্টোমার কোনও স্কীম বুঝতে না পারলে তাকে কত ধৈর্য সহকারে বোঝাবে কি ভাবে বোঝাবে তার একটা ডেমো দেখাতে বলা হল।একটা স্কীম ওর সামনে তুলে ধরে বলা হল এবার কাস্টোমারকে কি ভাবে কনভেন্স করাবেন। এই স্টেজে মোহনা একটু টাল মাটাল খেল এবং বুঝল এই যাত্রায় চাকরিটা ফসকে গেল। ইন্টারভিউ শেষে মোহনা অফিসের বাইরে বেরিয়ে দেখে রাজ তখনও দাঁড়িয়ে। ওর মেজাজটা মোটেও ভালো নেই ম্লান ভাবে ভ্রূ নাচিয়ে জিজ্ঞাস করল ..."কেমন? "রাজ বলল ..."ঠিকিই আছে তবে ওয়ার্কিং এক্সপিরিয়েন্স নেই সেই জন্য ভাবছিলাম। "মোহনা হতাশ ভাবে বলল..."আমার ভালো হয়নি। "রাজ ওর ফোন বের করল ..."তোমার নামম্বার দাও আমার ফোন নাম্বারটাও রাখ কোন জব ইন্টারভিউয়ের খবর পেলে নয় একে অপরকে জানাব। "
            




     বসন্তের এক সকাল মোহনা বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে। কোথা থেকে ভেসে আসছে কোকিলের মিষ্টি ধ্বনি। হালকা হাওয়ার মধ্যে ঝড়ে পড়ছে শুষ্কতা।মোহনার মোবাইলটা বাজতে ঘরে ঢুকে ফোনটা রিসিভ করল। ..."রাজ, কেমন আছ? কোনও খবর?"
..."খবর কিছু নেই তোমার খবর নেওয়ার জন্য ফোন করলাম।"মোহনা বলল ..."জি.কের বই খুলে বসেছি ভাবছি কমপিটিটিভ পরীক্ষায় বসব।"
..."বেশ তো আজ বিকেলে কি করছ? "
..."কিছু না। "
..."আমারও কোনও কাজ নেই চল দুজনে বসে কোথাও আড্ডা দেওয়া যাক। "মোহনা একটু চিন্তায় পড়ল। প্রথম ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে পরিচয় তার সঙ্গে বেরন কতটা সঙ্গত। ও একটু দ্বীধায় বলল ..."না.. আজ হয়ত বেরন হবে না। "
  ..."ঠিকাছে তোমায় জোর করব না।"বললো রাজ।
         




     কদিন পর একটা ইন্টারভিউয়ের খবর পেয়ে মোহনা ফোন করে রাজকে  বললো ..."সামনের সপ্তাহে একটা ইন্টারভিউ আছে ওখানে তোমার সি.ভি পাঠিয়ে দাও। "রাজ বিশেষ উৎসাহ দেখাল না। মোহনা জোর দিল ..."চল না তুমি থাকলে আমার সাহস বাড়ত। একদম অচেনা জায়গায় আমার খুব নার্ভাস লাগে একজন চেনা শোনা কেউ থাকলে ভালো হয়। "সব শুনে রাজ  রাজি হওয়ায় বেশ সাহস পেল মোহনা। 




       ইন্টারভিউ হবে পাঁচতলার বিল্ডিংয়ের অফিসে। বিল্ডিংয়ের গেটের সামনে মোহনা দেখল রাজ ওর জন্য   দাঁড়িয়ে আছে। ওকে দেখে ঘরির দিকে তাকিয়ে বলল ..."তোমার ইন্টারভিউ।আমি তোমার আগে এসে দাঁড়িয়ে আছি।"মোহনা অবাক হয় ..."ইন্টারভিউ তুমি দেবে না। "রাজ মুচকে হেসে বলল ..."তোমায় সাহস দিতে এলাম। "মোহনা বলে ..."সেকি শুধু শুধু এলে আমার খুব খারাপ লাগছে। "
..."ইন্টারভিউ ভালো ভাবে দাও তো! পরে নয় খারাপ ভালো বিচার করবে। "




      এই বারও ইন্টারভিউয়ের পর মোহনা আন্দাজ করল চাকরির সম্ভবনা ক্ষীন।দুজনে এক সঙ্গে ফুটপাথ ধরে হাঁটছে রাজ বলল ..."অত হতাশ হয়েও না একটা কিছু ঠিক জুটে যাবে ।আমি ভাবছি ম্যানেজমেন্টের কোর্সে ভর্তি হব।"
..."ভালো তো! আমি কি করব বুঝে উঠতে পারছি না।"
..."লেগে থাক ঠিক জুটবে কিছু একটা!"

            দুজনে অনেকটা সময় এক সঙ্গে কাটাল। ওর সঙ্গে গল্প করে মোহনা জানল রাজের বাবা একজন ইনসিওরেন্স এজেন্ট। কখনও ভালো রোজগার হয় কখনও খুবই টানা টানিতে সংসার চলে। সেরকম ভাবে কোনও দিনই উনি পয়সা রোজগার করতে পারেন নি। বাবার আর্থিক অবস্থা ভালো নয় তাই জোর করে কোনও কোর্স করার কথাও বলতে খারাপ লাগে ওর। ভেবেছিল পার্ট টাইম কোনও জব করে তার সঙ্গে ম্যানেজমেন্ট করবে কিন্তু তাও হয়ে উঠছে না। ওর সঙ্গে কথা বলতে বলতেই একটা ফোন এল রাজের বেশ উত্তেজিত ভাবে ফোনে কথা বলার পর রাজ  বলে ..."মোহনা আমার কলসেন্টারের জবটা হয়ে গেছে। ওদের অফিস থেকে ফোন এসেছিল।"ওর চোখে মুখে আনন্দ দেখে খুব ভালো লাগল মোহনার।বললো..."অনেক অভিনন্দন ।তুমি তো আর বেকার রইলে না। আর নিশ্চই আমার কথা মনে পড়বে না। "ও এক গাল হেসে বলল ..."কি যে বল! যখন ডাকবে তখনই পাবে।"





          একদিন সকালে মোহনাকে রাজ ফোন করে এক নিশ্বাসে বলে গেল ..."প্লিজ প্লিজ তোমার হেল্প দরকার।আজ বিকেলে দেখা করতেই হবে। ''মোহনা কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগই পেল না। বিকেলের সাক্ষাতে রাজ বলে..."প্রথম স্যালারী পেয়েছি। মায়ের জন্য একটা শাড়ি কিনব। আমি আবার ঐ শাড়ি টারি ঠিক বুঝি না চল না পছন্দ করে দেবে। "মোহনা বলে ..."বাবা এই ব্যাপার! আমি তো ঘাবড়ে গিয়েছিলাম কি জানি কি হল। "
..."তুমি আমার জন্য ঘাবড়ে গিয়েছিলে জেনে আমার বেশ ভালো লাগল!"বলে রারসিকতার ভঙ্গিতে তাকাল ।মোহনা মুখ চেপে হেসে বলে ..."ঢং করো না তো। "
..."আচ্ছা আমার জন্য আর কি ভাব? "
..."কিছুই ভাবি না।এবার চল শাড়িটা কিনি। "রাজ ওর মায়ের জন্য শাড়িটা কেনার পর একটা  তৃপ্তি ছড়িয়ে গেল ওর চোখ মুখে ।বললো ..."নিজের টাকায় মার জন্য শাড়ি কিনব ভাবিনি।আজ খুব ভালো লাগছে।"শাড়িটা হাতে নিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখতে দেখতে ওর চোখে মুখে মায়ের জন্য আবেগ ফুটে উঠতে দেখে মোহনার মনটাও হঠাৎ রাজের প্রতি সংবেদী  হয়ে উঠল।মোহনার মনের আবেগ আলতো করে ছুঁয়ে গেল ছেলেটা।রাজ ওর পকেট থেকে একটা পারফিউমের বক্স বের করে বলল..."এটা তোমার জন্য। "মোহনা বলে ..."কেন বাজে খরচ করলে।"
..."বাজে খরচ করিনি বুঝে খরচ করেছি ।এই পারফিউমের সুগন্ধ যেন আমাদের বন্ধুত্বেও ছড়িয়ে পড়ে।"বলে হাসল রাজ।
           




      বাড়ি ফিরে পারফিউমের শিশিটা নাকের কাছে ধরে সুমিষ্ট গন্ধের সঙ্গে মোহনার মনটা আজ একটা ভালোলাগার অনুভূতিতে হারিয়ে গেল ।যেন ও শুনতে পেল ওর হৃদস্পন্দনে রাজের নাম বারং বার  ধ্বনিত হচ্ছে।বিগত কিছুদিন ধরে  ওর সঙ্গে মিশে বুঝেছে ছেলেটা খুব দায়িত্বশীল।নিজের পায়ে দাঁড়াবার জন্য  সবসময় চেষ্টা করে যাচ্ছে।মোহনার ব্যাপারেও যথেষ্ট যত্নশীল। ওর সঙ্গে যখনই বেরিয়েছে মোহনা খেয়াল করেছে ও সব সময় ওকে আগলে রাখে।রাজকে ভালো লাগে মোহনার।হয়ত ভালোলাগাটা স্বাভাবিক কিন্তু বেশী কিছু ভাবতে চায় না মোহনা। রাজ হয়ত শুধু বন্ধুত্বের খাতিরে ওর সঙ্গে মিশছে। হয়ত ওর মনে ওর প্রতি কোনও বিশেষ অনুভূতি নেই।মোহনা বড্ড তাড়াতাড়ি কাউকে নিয়ে  এতটা ভাবছে।

            




     অনেক গুলো ইন্টারভিউ দিয়ে শেষমেষ  একটা  চাকরি পেয়ে যায় মোহনা।বেশ কিছুদিন হল চাকরিতে জয়েন করেছে ।কাজের ফাঁকে সময় পেলেই ফোনে কথা বলে রাজের সঙ্গে। ওর সঙ্গে কিছুক্ষন কথা বললেই যেন অনেকটা এনার্জি পেয়ে যায়। ওর সঙ্গে কথা না বললে মনে হয় দিনটাই আধা হয়ে রইল। রাজ কেমন যেন একটা হ্যাবিট হয়ে গেছে।





        অফিস থেকে বেরতে একদিন বেশ রাত হল। বার কয়েক রাজকে ফোন করল কিন্তু ও ফোন ধরল না।ভেবেছিল রাজের সঙ্গে বাড়ি চলে যাবে ওর অফিস খুব একটা দূরে নয়।আজ ওর ডে শিফট ছিল।কিন্তু রাজ ফোন না ধরায় বিরক্ত হয়ে মোহনা আর ফোনে ট্রাই না করে রাস্তায় বেরিয়ে একটা ট্যাক্সি দাঁড় করাতে যাবে তখন অফিসের এক সিনিয়ার কর্মী বললেন ..."আমার গাড়িতে চল পৌঁছে দেব।"ওনার গাড়িতে ওঠার পর ওনার আচরনে মোহনার একটু অস্বস্তি বোধ হল। হঠাৎ করে একটা নিম্ন মানের গান  হাই ভল্যুউমে চালিয়ে ওর দিকে বড়ই অশ্লীল দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন তিনি। এমন ভাবেই ওর দিকে তাকালেন যেন দর্শনের মাধ্যমেই ওর সকল রূপ সুধা পান করার জন্য পিপাসু তিনি। ওনার দৃষ্টি মোহনার মুখের পরিবর্তে বক্ষস্থলে কেন্দ্রীভূত। ঈষৎ অভদ্র আচরনের এই ব্যক্তিটি যখন মোহনাকে বলল ..."আজ রাত্রে কি প্ল্যান তোমার? "মোহনা তার উত্তরে বলল ..."গাড়িটা প্লিজ থামাবেন। "লোকটি ভ্রূ কুঁচকে তাকাতে মোহনা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল ..."আমার গন্তব্য স্থল এসে গেছে। "মাঝ রাস্তায় গন্তব্য স্থল হতে পারে না কিন্তু ওনার উহ্য প্রস্তাবে যে মোহনা অসন্তুষ্ট হয়েছে তা বোঝার মতন যথেষ্ট বয়স তার হয়েছে। উনি গাড়ি থামাতে মোহনা কোনও রকম সৌজন্য বিনিময় না করেই এগিয়ে গেল। এত দিন রাজের সঙ্গে কত জায়গায় গেছে কিন্তু আজ অবধি ও কখনও সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেনি। আজ এই লোকটার নোংরা মনটা দেখে যেন গা গুলিয়ে উঠল মোহনার।তখনই  রাজ ফোন করায় ওর ফোনটা পেয়ে আর আবেগ আটকাতে পারল না মোহনা।কেমন যেন কেঁপে গেল গলার স্বর।  কাঁপা গলায় বলল ..."ফোন ধরলে না কেন আজ কত বিপদে পরতাম জান। "রাজ উদগ্রীব হয়ে বলে ..."কোথায় তুমি? কি হয়েছে! আমি এখুনি আসছি। "রাজের অপেক্ষায় বাসস্টপেই দাঁড়িয়ে রইল মোহনা কিছুক্ষন পর হাঁফাতে হাঁফাতে রাজ আসে ..."কি হয়েছে আমি বন্ধুর বাইকে এলাম। "ওকে দেখে এবার কোনও কথা না বলেই হাঁটা দিল মোহনা। রাজ বলে ..."কি হল কোথায় চললে? কি হয়েছে বল? "
..."দেখলাম তুমি আমার জন্য কতটা সিরিয়াস। "বলে আবার হাঁটা ধরল মোহনা। রাজ ওর পথ আটকে বলে ..."রাস্তার মাঝে তোমার আমার সঙ্গে মসকরা করতে ইচ্ছে হল। তোমার ফোন পেয়ে আমি কতটা টেনশনে পড়েছিলাম জান। "মোহনা ওর চোখের দিকে তাকাতে রাজ অধীর আগ্রহে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। মোহনা ঠোঁটের কোনায় লাজুক হাসি এনে বলল..."সারা জীবন আমার জন্য এই রকম টেনশন নেবে। "রাজ ভ্রূ কপালে তুলে বলে ..."তুমি আমাদের দুজনের কথা বলছ আই মিন আর ইউ সিরিয়াস অ্যাবাউট আস। "
..."এর আগে এতটা সিরিয়িসলি কখনও কিছু ভাবিনি। "রাজ একটা স্বস্তির নিশ্বাস নিয়ে  বলল ..."আমার তোমাকে ভালোলাগলেও বলতে পারি নি ভেবেছি হয়ত আমাদের সুন্দর বন্ধুত্বটা নষ্ট হয়ে যাবে তোমার সঙ্গে বন্ধুত্বটা নষ্ট হলে আমার কাছে কিছুই থাকত না। "মোহনা বাসল। বললো..."এখন তোমার কাছে আছি আমি  আর আছে আমাদের দুজনের মাঝের সুন্দর সম্পর্ক।"©Pryamboda priya 
অনুভূতির আসর-Anuvutir asor

শুক্রবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৮

প্রেমে পরিণতি *

#তিক্ততা_পেরিয়ে
#রচনায় #প্রিয়ম্বদা_প্রিয়া

            চারিপাশের পরিবেশটা বেশ থম থমে।দেবযানী মুখ ভার করে সোফার এক কোণে বসে।বাবা গজ গজ করে বলে বেরিয়ে গেলেন ..."আমার কথাই শেষ কথা আমার ছেলেবেলার বন্ধু দীলিপ।ওর ছোট মেয়ের সঙ্গেই অয়নের বিয়ে দেব। এখানে আমি কারও কথা শুনব না।"অয়ন কোনও কথার প্রতিবাদ না করে চুপ করে বসে রইল। বাবা বেরিয়ে যাওয়ার পর দেবযানী বলল ..."কি রে তুই চুপ করে রইলি কেন? তুই আজকালকার ছেলে বাবা যার সঙ্গে বিয়ে দেবে তুই তাকেই বিয়ে করবি। তোর কোনও পছন্দ অপছন্দ নেই।"অয়ন কিছু বলতে যাবে সঙ্গে সঙ্গে দেবযানী ওর কথা থামিয়ে বলতে শুরু করল ..."যে মেয়েটার কথা বাবা বলল না, আমি ওকে ভালো করে চিনি একই স্কুলে পড়তাম তো।আমার চেয়ে জুনিয়ার হলে কি হবে এক নম্বরের বদমাশ মেয়ে ছিল। ছোট্ট থেকে পাকা। কত ছেলের সঙ্গে প্রেম পত্র বিনিময় করত তা আবার আমি জানি না। "অয়ন ভ্রূ কুঁচকে মুখটা বিরক্ত করে রইল। মা একটা ট্রেতে আম পোড়া সরবত এনে একটা গ্লাস দেবযানীর হাতে ধরিয়ে দিলেন..."বেশী করে বরফ দিয়েছি এটা খেয়ে ঠাণ্ডা হ। কি করবি! বাবার যখন ইচ্ছে তখন তুই এত বিরোধ করছিস কেন? "দেবযানী মায়ের উপর মেজাজ করে ..."তুমি তো তোমার হাজবেন্ডের বিরুদ্ধে কিচ্ছু বলবে না তাতে ছেলের সর্বনাশ হোক। "মা এক ধমক দেয় ..."দেবযানী। আমি কিছু বলছি না বলে তোর খুব মুখ বেড়ে গেছে। "দেবযানী এক লাফে উঠে দাঁড়ায় ..."বিয়ের পর মেয়েদের আর নিজের বাড়িতে কোনও মূল্য থাকে না ঐ মেয়ে ঘরে আনলে দেখবে তোমার সংসার দুদিনে কেমন ভাঙে। ওর দিদিও তাই করেছে বিয়ের এক বছর যেতে না যেতেই আলাদা হয়েছে তুমিও তৈরী থেকো। "বলে দেবযানী আম পানার সরবত সামনের টি টেবিলে ঠক করে রেখে রেগে গট মট করে চলে গেল। অয়ন জানলার দিকে তাকিয়ে আকাশ কুসুম ভাবতে লাগল কি জানি বাবা কোন ডাকিনীকে ঘরের বৌ করার জন্য অস্থির হয়ে পড়েছে। 





      অয়ন বরাবরই দিদির নেওটা। সব ব্যাপারে দিদির পরামর্শ নেয় অথচ বাবা এতটা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ যে অয়ন কোনও প্রতিবাদ করার জায়গাই পাচ্ছে না। বাবা আবার বলেছেন, ছেলে হিসেবে তোমার দায়িত্ব আমার সম্মান রাখা আমি ওদের কথা দিয়েছি তোমায় বিয়ে করতে হবে।বাবা অবশ্য কথা দেওয়ার আগে ওকে রিয়াকে দেখে আসতে বলেছিল ও দেখেওছে তখন অয়নের পছন্দ হয়েছিল বলেই বাবা কথা দিয়েছে এখন দিদি বেঁকে বসেছে তাই অয়ন দ্বিধায় পড়েছে। রিয়ার ছবিটা একবার বের করে এক দৃষ্টিতে দেখল। কোমল চেহারার মেয়েটার মৃদু হাসির পিছনে আবার এমন খলনায়িকাও থাকতে পারে ভেবে একটু অবাক হল। 
        





         দিদির সকল বাঁধা নিষেধ উড়িয়ে দিয়ে রিয়ার সঙ্গেই অয়নের বিয়ে ঠিক  হল। বর সজ্জায় অয়ন যখন গাড়িতে উঠল দিদিও ওর পাশে ওর টোপরটা হাতে ধরে বসল। সারাক্ষণ গাড়িতে বুদ্ধি দিল ..."প্রথম থেকেই শক্ত হবি।একবার যদি ও তোর নাগালের বাইরে চলে যায় তখন দেখবি সারা জীবন তোকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাবে। "অয়ন দিদির কথা গুলো গাঁট বাঁধে নিল।শুভ দৃষ্টির সময় রিয়া যেমন সুন্দর ভাবে অয়নের দিকে তাকাল অয়ন যেন একটু বিরক্ত হয়েই ওর দিকে তাকিয়ে শুভ দৃষ্টি সারল।








         বিয়ের পর নব বধূর আগমনে বাড়িতে সকলে আনন্দিত।আত্মীয়স্বজন পাড়া প্রতিবেশীর নতুন বৌ দেখার আগ্রহ। তার সঙ্গে একটু আলাপ করার ইচ্ছে। অয়নের মা তার নতুন বৌটির যত্নে ব্যস্ত। সবাইকে বলছেন ..."বাচ্চা মেয়ে গো। সবে গ্র্যাজুয়েট হয়েছে এত ধকল সইতে পারে তাই মুখ চোখ শুকনো লাগছে না হলে ও তো একদম পুতুলের মতন দেখতে।"রিয়ার লজ্জা লাগছিল কথা গুলো শুনে।আবার ভালোও লাগছে আজকের অনুষ্ঠান ওকে ঘিরে সবাই ওর জন্য এসেছে।
ভাত কাপড়ের কিছু আগে একটা লাল শাড়ি পরে খাটের মাঝখানে চুপটি করে বসে রিয়া। চোখে তার লজ্জা। মাথায় আলগা ভাবে  ঘোমটা দেওয়া।সিঁথি ভর্তি সিঁদুর।আত্মীয়দের মধ্যে কেউ কেউ ওর হাতটা ধরে গয়না নিরীক্ষণ করে জানতে চাইছেন বালাটা কে দিল চুড়টাও কি বাবা দিয়েছেন  বাড়ি থেকে কটা হার পেলে। রিয়া আস্তে আস্তে সব কথার উত্তর দিচ্ছে।অয়নের মা বললেন চল চল ভাত কাপড় দেওয়ার সময় হয়ে গেছে। সকলে সমবেত হয়ে হলঘরে জরো হল।অয়ন সাদা পায়জামা পাঞ্জাবি পরে দাঁড়িয়ে।ফর্সা বলিষ্ঠ চেহারার অয়নের দিকে লাজুক ভাবে একবার তাকাল রিয়া। অয়নের চোখে মুখে কোনও আনন্দ নেই ও যেন কোনও ভাবে প্রতরিত হয়েছে। ওর দিদির কথায়  রিয়ার সম্বন্ধে একটা নেগেটিভ ইমেজ তৈরী হয়ে গেছে অয়নের মনে। রিয়াকে দেখেই অয়নের মনে হয় রিয়ার পরিবার ওর বাবাকে ভুলিয়ে জোর করে অয়নের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছে।এই শান্ত শিষ্ট স্বভাবের মেয়েটার পূর্বে অনেক পুরুষ বন্ধু ছিল বর্তমানে ও অয়নকে নিজের মুষ্টিতে আবদ্ধ করার না না প্রচেষ্টা চালাবে। রিয়া ওর দিকে মিষ্টি করে হাসলে অয়ন মুখ গোমড়া করে থাকে। ওর দিকে তাকালে অয়নের মনে হয় এর আগেও কত ছেলের সঙ্গে এই সব ছলনা করেছে। ফুলশয্যার রাতে অয়ন অনেক রাত করে ওদের শোবার ঘরে ঢোকে। রিয়া অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ে। অয়নের বিতৃষ্ণা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে ও ঘুমন্ত নতুন বৌটির দিকে একবার তাকাতেও ইচ্ছে হল না।বার বার মনে হচ্ছে ওকে ইউজ করা হয়েছে। এখন এদের ইচ্ছেয় ওকে এই বিয়েটাকে সারা জীবন বইতে হবে।
       






           বিয়ের বেশ কিছুদিন পর  রিয়া একদিন একটা লাল সুতো নিয়ে অয়নের হাতটা ধরে বাঁধতে যাবে অয়ন ছিটকে সরে আসে।রিয়া থত মত খেয়ে বলে ..."মা তোমার জন্য পুজো দিয়েছিল তাই এই সুতোটা বাঁধতে বলেছে।"অয়ন মুখ চোখ বিকৃত করে বলে ..."ঐ সব কুসংস্কার নিজের বাড়িতে গিয়ে করবে আমার এই সব পছন্দ নয়। "নতুন বরের কাছে এমন কর্কশ শব্দ শুনে ওর চোখে জল চলে আসে ওকে দেখে অয়ন বলে ..."কথায় কথায় কান্নাকাটি আমার একদম অসহ্য লাগে। "বলে জোরে পা চালিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল । রিয়া একলা ঘরে দরজা বন্ধ করে খুব কাঁদে। বিয়ের পর থেকে অয়নের রুক্ষ আচরন ও খুব একটা গায়ে মাখেনি।নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার সঙ্গে অয়নের ব্যবহারে অত নজর দেয়নি। ভেবেছে হয়ত স্বভাবটাই এমন নিরস গোছের তবুও  মনের কোথাও ওরও একটা প্রশ্ন ছিল অয়ন কি এই বিয়েতে খুশি নয়। আজ ওর ব্যবহারের তীব্রতায় সেই অস্পষ্ট প্রশ্নের একটা উজ্জ্বল উত্তর পেল রিয়া। 





        বেশীর ভাগ সময় রিয়াও এখন মন মরা হয়ে থাকে।অয়ন সব সময় যেন রেগে আছে।তাই নিজে থেকে ওর সঙ্গে কথা বলতে ভয়ই হয় ওর।একদিন সন্ধেবেলায় অফিস থেকে ফিরে অয়ন দেখে মা বাবা বাড়িতে নেই কাজের লোক দরজা খুলে বলে..."বাড়িতে শুধু নতুন বৌ আছে মাসিমা মেসোমশাই দিদির বাড়ি গেছে। "নিজের ঘরে ঢুকে অয়ন দেখে অন্ধকার ঘর। ওর ঘরের সামনে একটা লম্বা বারান্দা আছে সেখানে থেকে কান্নার আওয়াজ আসছে। অয়ন ধীর পায়ে দরজার কাছে গিয়ে দেখে রিয়া বারান্দার এক পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। জ্যোৎস্নার রাত। চাঁদের আলোয় সিক্ত মেয়েটাকে একা দাঁড়িয়ে কাঁদতে দেখে খুব মায়া হল অয়নের কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারল না। ঘরে খাটে চুপ করে বসে রইল। ও জানে রিয়া ওর ব্যবহারের জন্যই কাঁদছে তাতে অয়নের খারাপ লাগলেও ওকে কাছে ডেকে শান্ত করাতেও ওর আত্মঅহমিকায় বাঁধে।দিদির কথা মত ও একটা বাজে মেয়ে এটাই ঠিক তাই অয়নকে ভাঙলে চলবে না ওকে শক্ত থাকতে হবে।তবু এতটা কি রুক্ষ হওয়া ঠিক।বার বার ভেবেও রিয়াকে ডেকে কিছুই বলতে পারল না। কোথায় যেন বাঁধল তা নিজেও টের পেল না অয়ন।হয়ত হঠাৎ করে নরম হওয়াটা সহজ নয় কঠোরতার মধ্যে ইগো চলে এলে সহজ হওয়াটা জটিল হয়ে যায়।







       একদিন মা বলল ..."তোদের মাঝে সব ঠিক ঠাক আছে তো অয়ন। রিয়ার চোখ মুখ কেমন যেন বসে গেছে। নতুন বৌ এর এমন চেহারা হয় নাকি?ওদের বাড়ির লোক দেখলে কি বলবে। বাচ্চা মেয়েটার সঙ্গে আপনারা কি এমন ব্যবহার করেন যে ওর চেহারাটা এমন খারাপ হয়ে গেছে। "রিয়াকে ডেকে মাথায় হাত বুলিয়ে উনি বললেন ..."তোর কোনও অসুবিধে হলে আমায় বলবি। আয় আজ তোর চুল বেঁধেদি। "বলে মা সুন্দর করে রিয়াকে সাজিয়ে দিলেন অয়নকে বললেন ..."আজ রিয়াকে নিয়ে বাইরে কোথাও ঘুরে আয়।"অয়ন মুখ চোখ বিরক্ত করে বলে ..."আমি কোথাও যেতে পারব না। "মাও চোখ পাকিয়ে বলে ..."আমি না শোনার জন্য বলিনি অয়ন।বড়দের কথা অমান্য করে তাদের অসম্মান করার শিক্ষা তো আমি তোকে দি নি। "অয়ন পরিস্থিতি গম্ভীর হয়ে যাচ্ছে দেখে রিয়ার সঙ্গে বেরল।







         রাস্তার ধারে একটা আইসক্রিমের দোকানে দাঁড়িয়ে দুজনে আইসক্রিম খাচ্ছে। সেই সময় একজন মাঝ বয়সী ভদ্রলোক রিয়ার দিকে এগিয়ে আসতে রিয়া একগাল হেসে ওনাকে প্রণাম করল। ভদ্রলোক ওর মাথায় একবার হাত রেখে অয়নের দিকে তাকিয়ে বললেন..."কি ইয়ংম্যান রিয়াকে খুশিতে রাখ তো?"রিয়া অয়নের দিকে তাকিয়ে বলল ..."উনি আমার কলেজের স্যার। "অয়ন আইসক্রিম হাতেই কোনও রকমে হাত জোড় করে প্রণাম জানাল। ভদ্রলোক বললেন ..."খুব ভালো মেয়ে পেয়েছ।ও আমার সব থেকে প্রিয় ছাত্রী।তবে খুব অভিমানী।তাই সামলে থেকো ভায়া। "বলে  উনি হাসতে হাসতে চলে গেলেন। অয়ন আড় চোখে শুধু দেখল রিয়াকে।
            




       একদিন অফিসে ব্রেক নিয়ে অয়ন বাড়ি ফেরে। সকাল থেকেই শরীরটা ভালো ছিল না জোর করেই অফিস গিয়েছিল ভাবল বাড়ি গিয়ে রেস্ট নেব। ঘরে ঢুকতে গিয়ে দিদির গলা পেল।ভাবল ভালোই হল দিদিকে বলবে মাথা টিপে দিতে আর কড়া এক কাপ চা বানাতে।কিছুটা এগোতে ওদের বেড রুমের কাছে যেতে শুনল দিদি যেন রিয়াকে কিছু বলছে।অয়ন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে শোনে দিদি বলছে ..."তোর বাবার অনুরোধ রাখার জন্যই অয়নের তোর সঙ্গে বিয়েটা হল।অয়ন তো কিছুতেই এই বিয়েতে রাজি ছিল না। আমার ভাইকে তো আমি চিনি ওর সব পছন্দ ওর জীবনের সব কিছুর ডিসিশন আমি নি। আমি ওর জন্য পাত্রি ঠিক করেছিলাম তা তো আর হল না। অয়নের যে মেয়েটাকে কলেজ লাইফে ভালো লাগত আমার ইচ্ছে ছিল তার সঙ্গেই বিয়েটা দি। যাক গিয়ে...। "বলে দিদি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।অয়নের অবাক লাগে দিদি কেন রিয়াকে মিথ্যে কথা বলল। ওর তো কারও সঙ্গেই প্রেম ভালোবাসা ছিল না। অয়ন ঘরে ঢুকতে দিদি একটু থতমত খেয়ে গেল যেন ওর চুরি ধরা পড়ে গেছে ..."কি রে হঠাৎ এলি! তোর তো এটা অফিসে থাকার সময়।"অয়ন কোনও কথার উত্তর দিল না।






         রাতে অয়নের জ্বর এল। সকাল বেলায় ডাক্তার দেখে ওষুধ পত্র দিয়ে গেলেন।মা বলল ..."রিয়া ওর মাথা ধুয়ে গা স্পঞ্জ করাতে হবে তুই করে দে আমি ওর জন্য একটা ঝোল ভাত করি। "রিয়া তার শাশুড়ি মার কথা মত সব কাজ করল।দু তিন দিনের মাথায় অয়নও সুস্থ হয়ে উঠল।  মা বললেন ..."লক্ষ্মী বৌ হয়েছে আমার। জানিস তো অয়ন কাল ওদের পাড়ার একজন ভদ্রমহিলা এসেছিলেন গাছের পেয়ারা নিয়ে। রিয়ার কি প্রশংসা করে গেলেন। ও পেয়ারা খেতে ভালোবাসে তাই ওর জন্য বয়ে নিয়ে এসেছিলেন। "রিয়া কোনও কথায় কোনও রকম প্রতিক্রিয়া না দিয়ে আলমারি খুলে ব্যাগ গোছাতে লাগল। মা বললেন ..."কোথায় যাস রিয়া।"
..."বাড়ি"
..."এখন যাবি! অয়ন যে এখনও ভালো ভাবে সেরে উঠল না। দুদিন পর যা।অয়ন তোকে পৌঁছে দেবে। "রিয়া স্থির দৃষ্টিতে মার দিকে তাকিয়ে বলল ..."তুমি ওর দিদিকে ডেকে নাও। ওর ভালো মন্দ দিদি বোঝে কি না। আমি আর ওর বোঝা হতে পারব না। "বলে ব্যাগের চেনটা এক ঝটকায় টেনে  কাধে ব্যাগ নিয়ে  রিয়া বেরিয়ে গেল। মা কৌতুহলী ভাবে ভ্রূ যুগলে প্রশ্ন চিহ্ন এনে অয়নের দিকে তাকালেন। অয়ন নিরুত্তর।মা বললেন ..."কি চলছে তোদের মাঝে? "অয়ন চুপ করেই রইল। কোনো উত্তর না পেয়ে অয়নের মা আরো অধৈর্য হলেন।মেয়েটা কি বলে গেল। গেলই বা কেন।উনিও  রুদ্র মূর্তি ধরলেন ..."রিয়া বাড়ি ছেড়ে কেন গেল উত্তর দে ?এই সংসারে আমি এখনো মরিনি। মরলে যা চাইবি নয় করিস!"অয়ন থতমত খেয়ে যায়। কি বলবে। ঝগড়াঝাঁটি তো হয়নি যা হয়েছে সবই মনে মনে।এদিকে মা উত্তেজিত হয়ে  চোখ মুখ লাল হয়ে  প্রেসার বেড়ে সারা শরীর কাঁপছে। অয়ন ভয় পেয়ে যায় মাকে কোনও রকমে শান্ত করে  যা যা হয়েছে  সব খুলে বলে। মা সব শুনে মাথায় হাত দেয়।বলে..."তুই এত বোকা এত ইমম্যাচুয়র তা তো জানতাম না।একটা মেয়ে বাড়ি ঘর নিজের লোক সবকিছু ছেড়ে তোর ভরসায় তোর সঙ্গে এসেছিল। তুই ওকে বিয়ে করে এনেছিলি ।তার সঙ্গে এমন দুর্ব্যবহার।তাও দেবযানীর কথায়। দেবযানী চিরকালের জেদি।ওর ইচ্ছায় তোর বিয়ে না হওয়ায় ও তোদের সম্পর্কে বিষ ঢেলে গেছে আর তুই সেই বিষ খেয়ে গেলি।আর তার বিরূপ প্রতিক্রিয়ার প্রভাব ফেললি তোদের সম্পর্কে। কবে সেই স্কুলে ও কাউকে চিঠি পাঠিয়েছিল না ওকে কেউ চিঠি দিয়েছিল তাতে মেয়েটার চরিত্রের বিচার করলি ।এত ছোট মন তুই কোথায় পেলি অয়ন। আজ আমার নিজের শিক্ষায় ঘেন্না হচ্ছে যেমন আমার মেয়ে যে নিজের জেদের জন্য ভাইয়ের জীবন নষ্ট করতে দ্বিধা করে না তেমন আমার ছেলে যার সংকীর্ণ মন একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করল।"অয়নের মা তখনও খাটে বসে রাগে অভিমানে কাঁপছে ।অয়ন ধপ করে মাটিতে বসে মায়ের কোলের কাছে মাথা রেখে পা দুটো জড়িয়ে ধরে। মা  বললেন ..."যদি রিয়াকে এবাড়িতে ফিরিয়ে আনতে না পারিস তবে ভবিষ্যতে আমার সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখবি না।আমি কেন তোর বাবা জানলে সে কাউকে মুখ দেখাতে পারবে না। নিজেদের বন্ধু মহলে কি রেপুটেশন হবে তোর বাবার সেটা ভেবছিস?"
           







          পরদিন সকালে অয়ন রিয়াদের বাড়ির কলিং বেল বাজতে রিয়াই দরজা খুলল ।ওকে দেখে একটু অবাক হয়েই তাকিয়ে রইল। বাড়ির সকলে অয়নকে দেখে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তাদের আচরনে অয়ন বোঝে রিয়া বাড়িতে কিছুই বলেনি। রিয়ার মা বলল ..."তোমায় কেমন শুকনো শুকনো দেখাচ্ছে শরীর ভালো নেই বুঝি। "অয়ন বলল ..."আমার কদিন আগে জ্বর হয়েছিল এখনও ভালো সুস্থ হয়ে উঠিনি আমি রিয়াকে নিতে এসেছি। "রিয়ার মা ব্যস্ত হয়ে ওঠে। রিয়াকে বকাবকি করে ..."অসুস্থ ছেলেটাকে ছেড়ে তুই চলে এলি এটা আমি তোর কাছ থেকে আশা করিনি।"অয়ন বলে ..."ওকে কিছু বলবেন না। আমার উপরে রাগ করে ও এসেছে।"সকলের সামনেই অয়ন বলল ..."রিয়া আই অ্যাম সরি! প্লিজ বাড়ি চল। "মা বলেন ..."স্বামী স্ত্রীর ঝগড়ায় কেউ ঘর ছেড়ে আসে। তুমি চিন্তা করো না অয়ন আজকের দিনটা থাকো।  কাল নয় দুজনে এক সঙ্গে যেও। "






          রিয়া ওদের ঘরে  কোনও রকম ব্যবহারের পরিবর্তন না করেই  বিছানা ঠিক করতে লাগল। অয়ন কি বলবে বুঝে উঠতে পারছে না। রিয়াও একটু বেশী ব্যস্ত হয়ে ঘর গোছাতে শুরু করে দিয়েছে।অয়ন ওর কাছে এসে ওর হাতটা ধরে বলল ..."একটু বোস।"রিয়া শান্ত ভাবে ওর পাশে বসল। অয়ন বলল ..."আমাদের মাঝে একটা অস্বস্তি ছিল ঠিকই কিন্তু আমি আর কোনো রকম মন মালিন্য আমাদের মাঝে আনব না। চলো ফ্রেশ ভাবে লাইফ শুরু করি!"রিয়া বললো ..."মা পাঠিয়়েছেন তোমাকে! "অয়নের মাথাটা নীচু হয়ে গেল।
..."মা আর দিদি যা বলে তুমি তাই কর? তোমার নিজের ব্যক্তিত্বর এতো অভাব! "রিয়ার রাগটা খুবই স্বাভাবিক তা বুঝল অয়ন।বললো ..."দিদিকে খুব বিশ্বাস করতাম আমার হয়ত এটাই সব থেকে ভুল হয়েছে।তবে সব ভুলে কি নতুন ভাবে শুরু করা যায় না!"লম্বা শ্বাস ফেলে রিয়া বললো ..."যায়! "
..."সব ভুলে?"রিয়া বললো ..."তোমার গার্লফ্রেণ্ডকে ভুলতে পারবে! "এবার হেসে ফেললো অয়ন ..."গার্লফ্রেণ্ড তো কোনো কালে ছিল না তবে একটা বউ পেয়েছি যাকে আর রাগাতে চাই না! "ঠোঁটের কোণায় হাসি ফুটল রিয়ার বললো ..."মনে থাকবে! "
..."এবার থেকে শুধু তুমিই আমার মনে থাকবে। "কথা দিয়ে পরিস্থিতি হালকা করতে পরিস্থিতিই শিখিয়ে দিয়েছে অয়নকে।রিয়ার দিকে তাকাল অয়ন।রিয়াও তাকাল অয়নের চোখে।মাঝে ছিল না  কোনো ভুল বোঝাবুঝি কোনো ইগো । আজ নতুন করে হল ওদের শুভ দৃষ্টি।


"©Pryamboda priya 
অনুভূতির আসর-Anuvutir asor (ফেসবুক পেজ )